অন্তর্ঘাতমূলক ভূ-রাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে পোশাক শিল্প

অনলাইন ডেস্কঃ
৪ নভেম্বর, ২০২৬ ৪:১৪ পিএম
শেয়ার করুন:
অন্তর্ঘাতমূলক ভূ-রাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে পোশাক শিল্প

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতা, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুরের ঘটনাকে কেবল সাধারণ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন হিসেবে দেখছেন না অপরাধবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিশ্ববাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের মারপ্যাঁচে দেশের এই রফতানি খাতকে পঙ্গু করে দিতে সুদূরপ্রসারী ও অন্তর্ঘাতমূলক চক্রান্ত চালানো হচ্ছে।

মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া বনাম আকস্মিক সহিংসতা
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে পোশাক শ্রমিকদের জীবনযাত্রার খরচ সামাল দিতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক। সরকার ইতোমধ্যেই মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর ‘নিম্নতম মজুরি বোর্ড’ গঠন করেছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও শ্রমিক নেতাদের মতে, বোর্ড আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে এবং আগামী জানুয়ারি থেকেই শ্রমিকদের বর্ধিত ও উপযুক্ত মজুরি প্রদানের লক্ষ্যে একটি রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। 

তবে প্রশ্ন উঠেছে আন্দোলনের সময় নিয়ে। মজুরি নির্ধারণের সাংবিধানিক ও গঠনমূলক প্রক্রিয়া যখন চলমান, ঠিক তখনই পোশাকের আন্তর্জাতিক ডেলিভারির সর্বোচ্চ ব্যস্ত সময়ে (পিক-টাইম) কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও রাজপথ অবরোধের মতো সহিংস ঘটনা সাধারণ শ্রমিকদের চেয়ে কোনো অশুভ মহলের উসকানির দিকেই বেশি ইঙ্গিত করে।

ভূ-রাজনৈতিক বাণিজ্য ও ইউরোপীয় বাজারের সমীকরণ
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই অস্থিরতার পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়ন্ত্রণ দখলের এক অদৃশ্য লড়াই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ভারতের সম্ভাব্য মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। 

বর্তমানে ইউরোপের পোশাক বাজারের প্রায় ১৯.৫ শতাংশ একাই নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ, বিপরীতে ভারতের অংশ মাত্র ৪.৫ শতাংশ। বর্তমানে ইউরোপে ভারতীয় পণ্যের ওপর ১২ শতাংশ শুল্ক থাকলেও মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে তা শূন্যে নেমে আসবে। ফলে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের শক্ত প্রতিযোগী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে ভারত। বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘জারা’-সহ বড় বড় ইউরোপীয় রিটেইলারদের বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রবিন্দু এখন বাংলাদেশ। এই বিপুল আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ ও বাজার একলপ্তে নিজেদের কবজায় নিতে প্রতিযোগী পক্ষগুলো কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে।

‘হাইব্রিড অন্তর্ঘাত’ ও নেতিবাচক প্রচারণার কৌশল
অর্থনৈতিক অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই অস্থিরতাকে একটি আধুনিক 'হাইব্রিড অন্তর্ঘাত' হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বাংলাদেশকে বিতর্কিত করতে পরিকল্পিতভাবে কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে ব্যবহার করে কারখানার ভেতরের ছোটখাটো ভুলত্রুটি অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরা হচ্ছে। 

এই কৌশলের মূল লক্ষ্য মূলত তিনটি:
১. উৎপাদন ব্যাহত করা: বছরের শেষভাগে পণ্য সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে সময়মতো চালান পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করা।  
২. আন্তর্জাতিক আস্থা নষ্ট: পশ্চিমা বায়ারদের মনে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ঝুঁকিপূর্ণ।  
৩. বাজার স্থানান্তর: পরবর্তী মৌসুমগুলোর নতুন বড় বড় চুক্তি নিশ্চিত করার আগেই ইউরোপীয় ক্রেতাদের বিকল্প বাজারমুখী হতে বাধ্য করা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশীয় কিছু সুবিধাভোগী, পলাতক রাজনৈতিক চক্র ও স্বার্থান্বেষী মহলের অর্থায়নে সাধারণ শ্রমিকদের কাঁধে ভর দিয়ে এই বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হচ্ছে, যার চরম মূল্য দিতে হতে পারে দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে।

প্রতিরোধ ও করণীয়
শিল্পাঞ্চলে সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ভূমিকা রাখার পাশাপাশি শ্রমিক নেতারা মজুরি বোর্ডের টেবিলে যৌক্তিক মজুরির দাবি আদায়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। 

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এই অস্থিরতার নেপথ্যে থাকা অর্থের উৎস, ব্যাংক লেনদেন এবং পর্দার আড়ালের মূল পরিকল্পনাকারীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সাথে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মালিক, শ্রমিক ও রাষ্ট্র—সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই জাতীয় সম্পদ রক্ষা করতে হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।