মধুমতীর বুকে বৈঠার ছন্দ, তীরে লাখো মানুষের ঢল: মহম্মদপুরে জমজমাট নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা

বিশ্বজিৎ সিংহ রায়, স্টাফ রিপোর্টার, মাগুরাঃ
২ নভেম্বর, ২০২৬ ১১:২১ এএম
শেয়ার করুন:
মধুমতীর বুকে বৈঠার ছন্দ, তীরে লাখো মানুষের ঢল: মহম্মদপুরে জমজমাট নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা

মাগুরার মহম্মদপুরে মধুমতী নদীর বুকে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা ও বর্ণাঢ্য গ্রামীণ মেলা। নদীর জলতরঙ্গে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ ছন্দ, কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনি আর মাঝিমাল্লাদের সুরের মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে ওঠে নদীর দুই কূল। আবহমান গ্রামবাংলার এই প্রাচীন ঐতিহ্য উপভোগ করতে নদীর দুই তীরে নেমেছিল লাখো মানুষের ঢল; উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো উপজেলাজুড়ে। 

রোববার (১ নভেম্বর ২০২৬) বিকেলে মহম্মদপুরের এলাংখালী সেতুসংলগ্ন মধুমতী নদীতে এ বর্ণাঢ্য নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা ১২টি সুসজ্জিত বাছারি ও কোষা নৌকা অংশ নেয়।

সকাল থেকেই প্রতিযোগিতা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে নানা বয়সী হাজারো মানুষ জড়ো হতে থাকেন। নারী, পুরুষ ও শিশুদের উপস্থিতিতে নদীর দুই তীর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। বিকেল সাড়ে ৩টায় চড়ন্দারের ঘণ্টার টং টং শব্দের তালে তালে শুরু হয় বাইচ। মাঝিমাল্লারা একযোগে বৈঠা টেনে তীব্র গতিতে নৌকা ছুটিয়ে নেন গন্তব্যের দিকে। মুহূর্তে বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের হর্ষধ্বনি আর বাঁধভাঙা দর্শকদের উল্লাসে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মধুমতীর বুক।

নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে মহম্মদপুর উপজেলা সদরসহ আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামে কয়েক দিন আগে থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের আগমন ঘটে। নদীর পাড়ে বসে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। হরেক রকমের মিষ্টির পসরা, মাটির তৈরি খেলনা ও লোকজ পণ্যের দোকানে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় পুরো এলাকায় এক প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি করে। 

‘মহম্মদপুর মধুমতী নৌকাবাইচ ও মেলা-২০২৬ পরিচালনা কমিটি’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং আর্থিক সহযোগিতা দেয় রূপায়ণ গ্রুপ।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রতিযোগিতার শুভ উদ্বোধন করেন। প্রতিযোগিতা শেষে তিনি বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে আবহমান বাংলার রূপ তুলে ধরতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। 

মধুমতী নৌকাবাইচ ও মেলা কমিটির সভাপতি এবং মহম্মদপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অধ্যক্ষ মৈমুর আলী মৃধার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন, জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. আলী আহম্মেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল কাদের, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. হাসিনা মমতাজ, মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুনাহার, মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রী এবং মহম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম. শামীম আহম্মেদ।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট রোকনুজ্জামান, অ্যাডভোকেট মিথুন রায় চৌধুরী, অধ্যক্ষ (অব.) মো. মতিউর রহমান, শালিখা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন, মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান কাবুল, কাজী সালিমা হক মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম ইউনুচ আলী, সহযোগী অধ্যাপক ড. এম এম রইচ উদ্দীন, অ্যাডভোকেট আহসান হাবীব খান সোহেল, মো. মহিদুল ইসলাম, মো. শরিফুজ্জামান টুকু, যুবদলের আহ্বায়ক মো. তরিকুল ইসলাম তারামিয়া ও স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. আরিফুজ্জামান মিল্টনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

সব মিলিয়ে গ্রামবাংলার নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অপূর্ব মিলনমেলায় রূপ নিয়েছিল এবারের মধুমতী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।