৩২ শিক্ষকের পদ শূন্য, ধুঁকছে সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থী

সেকেন্দার আলী বাবলু, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
২৯ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪৪ এএম
শেয়ার করুন:
৩২ শিক্ষকের পদ শূন্য, ধুঁকছে সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থী

কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে তীব্র শিক্ষকসংকটে সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কলেজটিতে অনুমোদিত ৬০টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৮ জন। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ ১২টি প্রধান বিষয়সহ মোট ৩২টি পদই শূন্য। দীর্ঘদিন ধরে চলা জনবলঘাটতি ও নানা প্রশাসনিক জটিলতার পর সম্প্রতি স্থায়ী অধ্যক্ষ যোগদানের ফলে কলেজটিতে শৃঙ্খলা ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ শুরু হলেও শিক্ষকসংকট কাটানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞান বিভাগ ও একাডেমিক সংকট:  

প্রভাষক সাহেব আলী ও তপতি রানী জানান, ৬০টি পদের অর্ধেকেরও বেশি শূন্য থাকায় এবং গ্রন্থাগারিক, শরীরচর্চা শিক্ষক ও প্রদর্শক পদে জনবল না থাকায় সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। শিক্ষকসংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বিজ্ঞান বিভাগের ওপর। শিক্ষক না থাকায় ব্যবহারিক ল্যাব দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে ছিল এবং নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় এই বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি আশঙ্কাজনক হারে কমছে। 

বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েও শিক্ষকসংকটের কারণে মানবিক বিভাগে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছেন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী সিরাতুন বিনতে বুশরা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিজ্ঞান ছেড়ে মানবিকে এলেও এখানেও ইংরেজি সহ মূল বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছি।”

আর্থিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ:  

জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে মীর মুহঃ হাবিবুল্লাহর হাত ধরে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষদের দিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়। দীর্ঘ প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে গত ৮ জুন ২২তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা প্রফেসর মো. জহুরুল হক স্থায়ী অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি কলেজের তহবিল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় চরম অব্যবস্থাপনা দেখতে পান। ৩৩টি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল শূন্য, এমনকি একটি চলতি হিসাবে মাত্র ৩০০ টাকা অবশিষ্ট ছিল। অতিথি শিক্ষক ও মাস্টাররোল কর্মচারীদের দুই মাসের বেতন বকেয়া ছিল। দায়িত্ব নিয়েই অধ্যক্ষ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বকেয়া বেতন পরিশোধ করেন এবং শিক্ষকঘাটতি সামাল দিতে ৩ জন কর্মরত অতিথি শিক্ষকের পাশাপাশি নতুন ১২ জন অতিথি শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন।

প্রশাসনিক গতিশীলতা ও অবকাঠামো সংস্কার:  
নতুন অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণের পর কলেজটির ভেতরে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে ‘১০ জনে ১ শিক্ষক’ মনিটরিং ব্যবস্থা। প্রভাষক মিনারা বেগম ও সংগীতা রানী জানান, প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর তদারকির দায়িত্ব একজন শিক্ষকের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি কমাতে সাহায্য করছে। পাশাপাশি ক্যাশবই, রেজিস্টার ও চেকবই সংরক্ষণসহ প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ফিরেছে।

প্রভাষক ফাতেমা বেগম ও সহকারী অধ্যাপক সাজেদুর রহমান মণ্ডল জানান, অধ্যক্ষের উদ্যোগে শ্রেণিকক্ষে ফ্যান সংযোজন, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, ব্যবহারিক ল্যাব সংস্কার, সীমানাপ্রাচীর ও ছাত্রীদের ওয়াশরুম মেরামতসহ অবকাঠামোগত ব্যাপক সংস্কার কাজ চলছে।

কলেজের কর্মচারী নিতাই চন্দ্র রায় বলেন, “এখন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কড়া নিয়মে দায়িত্ব পালন করতে হয়। মনে হচ্ছে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হাবিবুল্লাহ স্যারের আমলের সেই নিয়মনিষ্ঠা আবার ফিরে এসেছে।”

অধ্যক্ষের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা: 
কলেজের সার্বিক বিষয়ে অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. জহুরুল হক বলেন, “কলেজে বিদ্যমান নানা সংকট কাটিয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফেরাতে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিথি শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামো সংস্কারের কাজ করছি। তবে কলেজকে পূর্ণাঙ্গরূপে সাজাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সুশীল সমাজের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।”

বর্তমানে একাদশ, দ্বাদশ, স্নাতক (পাস) এবং ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু থাকা এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক গতিশীলতা ফিরলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত শূন্য পদে সরকারি শিক্ষক পদায়ন এখন সময়ের দাবি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।