বাতির নিচে অন্ধকার: কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোলঘেঁষেও আলোহীন কলাবুনিয়া পাড়া

রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ
২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১২ পিএম
শেয়ার করুন:
বাতির নিচে অন্ধকার: কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কোলঘেঁষেও আলোহীন কলাবুনিয়া পাড়া

যে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতে আলোকিত হয় গোটা বাংলাদেশ, তার মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরত্বের একটি জনপদ আজও নিমজ্জিত আদিম অন্ধকারে। ১৯৬২ সালে চালু হওয়া ঐতিহাসিক কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ হলেও তার প্রতিবেশী রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ৩ নম্বর চিৎমরম ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ‘কলাবুনিয়া পাড়া’য় ছয় দশকের বেশি সময়েও পৌঁছেনি কোনো বৈদ্যুতিক বাতি।

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আধুনিক ডিজিটাল যুগেও এই জনপদের অর্ধশতাধিক মারমা পরিবারের রাত কাটে কুপি আর হারিকেনের টিমটিমে আলোয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কর্ণফুলী রেঞ্জের আওতাধীন এই পাহাড়ি জনপদে ১৯৮৪ সালে মারমা সম্প্রদায়ের ১৫টি পরিবার প্রথম বসতি শুরু করে। বর্তমানে সেখানে পরিবারের সংখ্যা অর্ধশতাধিক ছাড়িয়েছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একদম সন্নিকটে অবস্থান হওয়া সত্ত্বেও কর্ণফুলী নদী ও মাঝখানের লুসাই পাহাড়ের ভৌগোলিক দূরত্বের অজুহাতে আজও এই জনপদে উন্নয়নের আলো পৌঁছেনি। অথচ চিৎমরম ইউনিয়নের লংকা মুখ পাড়া, চংড়াছড়ি পাড়া, আগা পাড়া, নাইন্দমা ছড়া পাড়া ও আমতলী পাড়ায় অনেক আগেই বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছেছে। কেবল কলাবুনিয়া পাড়াই রয়ে গেছে চরম অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার।

বিদ্যুৎহীনতার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ। বাংলাদেশ সুইডেন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজ, কাপ্তাই উচ্চ বিদ্যালয়, শহীদ শামসুদ্দীন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও চিৎমরম উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অন্তত ২০-২৫ জন শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পর ঠিকমতো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না।

স্থানীয় সমাজসেবক সুচিংপ্রু মারমা বুকভরা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, *“আজকের ডিজিটাল যুগেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আলোর মুখ দেখছে না। এলাকার সামান্য দু-একটি পরিবার কষ্ট করে সোলার প্যানেল বসালেও, বাকি অসচ্ছল পরিবারগুলোর তা কেনার সামর্থ্য নেই। বাধ্য হয়ে হারিকেনের আলোয় দিন কাটাতে হচ্ছে। পড়াশোনার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা।”*

কলাবুনিয়া পাড়ার হেডম্যান পাইংপ্রু অং মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, *“ভোটের আগে রাজনৈতিক নেতারা বিদ্যুতের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু ভোট শেষ হলে আর কেউ পাহাড়ের এই অবহেলিত মানুষের খবর নেয় না।”*

এ বিষয়ে চিৎমরম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়েশ্লিমং চৌধুরী বলেন, *“জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের এত কাছে থেকেও নানা জটিলতায় সেখানে আলো পৌঁছানো যায়নি। আমরা বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেছি। দ্রুত এর সমাধান হওয়া জরুরি।”*

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, এলাকাটিতে সংযোগ দিতে হলে নিকটস্থ মেইন লাইন থেকে আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫টি নতুন বৈদ্যুতিক খুঁটি (পোল) স্থাপন করতে হবে।

কাপ্তাই বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়ে তাদের কাছে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন আসেনি। তবে তিনি দ্রুত এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

যে কাপ্তাইয়ের পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র সারা দেশকে আলোকিত করছে, সেই কাপ্তাইয়েরই বুকের ভেতর অবস্থিত কলাবুনিয়া পাড়ার মানুষ আর কতকাল অন্ধকারের বন্দিশালায় থাকবে—এখন সেই প্রতীক্ষাতেই দিন গুনছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।