‘আটবার ঘর সরিয়েছি, এখন আর সরানোরও জায়গা নেই’

অনলাইন ডেস্কঃ
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১১:৪৭ এএম
শেয়ার করুন:
‘আটবার ঘর সরিয়েছি, এখন আর সরানোরও জায়গা নেই’

বর্ষা মৌসুম এলেই নীলফামারীর তিস্তাপারের মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা। উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর নদীর উত্তাল স্রোতে শুরু হয় এক নির্মম জীবনসংগ্রাম। রাত পোহালেই বহু বছরের স্মৃতিবিজড়িত বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটে পারের মানুষের। 

আটবার ভিটে হারানো অফেজা বেগমের দীর্ঘশ্বাস
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের কেল্লাপাড়া এলাকার ষাটোর্ধ্ব অফেজা বেগম এই নদীভাঙনের এক জীবন্ত সাক্ষী। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “বিয়ের পর যখন এ বাড়িতে আসি, তখন তিস্তা নদী অনেক দূরে ছিল। টিনের ঘর ছিল, ফলের বাগান আর ফসলি জমি ছিল। একে একে সব নদী গিলে খেয়েছে। এ পর্যন্ত আটবার ঘর সরিয়েছি, এখন আর সরানোর মতো কোনো জায়গাও অবশিষ্ট নেই। আর কতবার ঘর হারালে একটা স্থায়ী বাঁধ হবে?”

পানি কমতেই তীব্র হচ্ছে ভাঙন
সম্প্রতি তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর কেল্লাপাড়াসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এখন পানি কমতে শুরু করায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। ইতোমধ্যে অন্তত পাঁচটি পরিবারের বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বসতভিটা, উঠান ও ফসলি জমি তিস্তায় তলিয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছে পরিবারগুলো। 

যাদের বিকল্প জমি আছে, তারা ঘর ভেঙে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন। আর যাদের কোনো উপায় নেই, তারা সামান্য দূরেই আবার নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছেন—এই আশায় যে, হয়তো এবার কিছুদিনের জন্য রেহাই মিলবে।

দেখা দিয়েছে মানবিক সংকট
ভাঙন ও স্থানান্তরের কারণে অনেক পরিবারে কয়েক দিন ধরে চুলা জ্বলেনি। বিশুদ্ধ পানীয় জল, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার চরম সংকট দেখা দিয়েছে। মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন শিশু ও বয়স্করা।

ত্রাণ নয়, স্থায়ী সমাধান চান তিস্তাপারের মানুষ
সাময়িক ত্রাণ কিংবা জিওব্যাগের বস্তায় আর ভরসা রাখতে পারছেন না তিস্তাপারের বাসিন্দারা। 
স্থানীয় বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন, “আমরা ত্রাণ চাই না। ত্রাণ দিয়ে জীবন চলে না। আমরা একটা স্থায়ী বাঁধ চাই, যেন প্রতিবছর ঘর হারানোর ভয়ে রাত জাগতে না হয়।”
আবু তালেব নামের আরেকজন বলেন, “আমাদের দুর্ভোগের একমাত্র স্থায়ী সমাধান ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন। বছরের পর বছর শুধু আশ্বাসই শুনে আসছি, কিন্তু কাজের কোনো রূপরেখা দেখছি না।”

কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ ও আশ্বাস
জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ডিমলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, কেল্লাপাড়া এলাকায় নদীভাঙন ঠেকাতে প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। নতুন করে ভাঙন দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান জানান, পানিবন্দি ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে শুকনো খাবারসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো হচ্ছে।

দীর্ঘদিনের অধরা স্বপ্ন
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই—কত দিন চলবে এই সাময়িক তালি মারা ব্যবস্থা? প্রতিবছরের ত্রাণ কিংবা জিওব্যাগ নয়, তিস্তাপারের মানুষ চান দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা। বহুল আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানই পারে এই নিঃস্ব মানুষগুলোকে একখণ্ড ভিটেমাটির নিশ্চয়তা দিতে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।