পাহাড়ের প্রতিকূলতা পেরিয়ে আদালতের কাঠগড়ায়: আইনজীবী হ্লানুচিং মারমার অদম্য লড়াইয়ের গল্প

রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫:২৩ পিএম
শেয়ার করুন:
পাহাড়ের প্রতিকূলতা পেরিয়ে আদালতের কাঠগড়ায়: আইনজীবী হ্লানুচিং মারমার অদম্য লড়াইয়ের গল্প

কাপ্তাইয়ের শান্ত-শ্যামল ডংনালা গ্রাম থেকে আদালতের কাঠগড়া—দীর্ঘ এই পথচলার গল্পটি কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; এটি অদম্য মনোবল, অধ্যবসায় ও শিক্ষার আলোয় পথ খুঁজে নেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পাহাড়ের নানামুখী প্রতিকূলতা ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে আইন পেশায় নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তরুণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট হ্লানুচিং মারমা।

রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের ডংনালা গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে হ্লানুচিং মারমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা মংসুইপ্রু মারমা এবং মা মাঅংচিং মারমার জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি। তাঁর ছোট ভাই বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছেন। কোনো জৌলুস নয়, বরং পরিবারের অকৃত্রিম সমর্থন আর নিজের ইস্পাতকঠিন মনোবলকে পুঁজি করেই এগিয়ে গেছেন তিনি।

হ্লানুচিং মারমার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি নিজ গ্রামের ডংনালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে সাফল্যের সাথে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে। ২০১২ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। এরপরই শুরু হয় তাঁর আইনজীবী হওয়ার স্বপ্নজয়ের আসল সংগ্রাম।

দৃঢ় প্রত্যয় ও কঠোর পরিশ্রমে হ্লানুচিং ২০১৪ সালে দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে (২২তম ব্যাচ) ভর্তির সুযোগ পান। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের জটিল পাঠ সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করার পর ২০২৩ সালে অর্জন করেন বহুল কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ।

বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে নিয়মিত আইন পেশা পরিচালনা (প্র্যাকটিস) করছেন। প্রান্তিক পাহাড়ি জনপদ থেকে উঠে এসে বিচারালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখা এই তরুণ আইনজীবী আজ পাহাড়ের যুবসমাজ ও নতুন প্রজন্মের কাছে এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণার প্রতীক।

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে অ্যাডভোকেট হ্লানুচিং মারমা বলেন, "পাহাড়ি অঞ্চলের প্রান্তিক, অসহায়, দরিদ্র এবং ন্যায়বিচারবঞ্চিত মানুষের পাশে আইনি ঢাল হয়ে দাঁড়ানোই আমার জীবনের মূল ব্রত। সাধারণ মানুষ যেন আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার না হয়, সেই লক্ষ্যে সততার সাথে কাজ করে যেতে চাই।"

হ্লানুচিং মারমার এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জন আবারও মনে করিয়ে দেয়—লক্ষ্য যদি অবিচল থাকে আর পরিশ্রমে কোনো ফাঁকি না থাকে, তবে পাহাড়সম প্রতিকূলতাও একজন মানুষের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারে না।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।