যে হত্যাকাণ্ডে কেঁদেছিল দেশবাসী, শুধু কান্নার অধিকার ছিল না স্ত্রী-কন্যার

অনলাইন ডেস্কঃ
৩০ জুলাই, ২০২৬ ১২:২১ পিএম
শেয়ার করুন:
যে হত্যাকাণ্ডে কেঁদেছিল দেশবাসী, শুধু কান্নার অধিকার ছিল না স্ত্রী-কন্যার

টেকনাফের জনপ্রিয় কাউন্সিলর একরামুল হকের সেই হাড়হিম করা ফোনালাপ আর আকুতি একদা নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। তৎকালীন র‍্যাব-৭-এর কথিত ‘ক্রসফায়ারের’ নামে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের পর স্বজন হারানোর বেদনায় মন খুলে কান্নার অধিকারটুকুও পায়নি তাঁর পরিবার। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় নজরদারি, অবরুদ্ধ জীবন ও ভিটেমাটিচ্যুত থাকার পর অবশেষে দীর্ঘ আট বছর পর বিচারে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছেন একরামের স্বজনেরা।

সেই নির্মম রাতের ফোনালাপ
২০১৮ সালের ২৬ মে গভীর রাতে বাবার ফিরতে দেরি দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন দিয়েছিল অষ্টম শ্রেণিতে পড়া বড় মেয়ে তাহিয়া হক। ওপাশ থেকে বাবার চেনা কণ্ঠ ভেসে এলেও তাতে ছিল মৃত্যুর হিমশীতল আতঙ্ক। অবুঝ তাহিয়ার প্রশ্ন ছিল—*‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে?’* কিন্তু মেয়ের সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আর হয়নি একরামের। মা আয়েশা বেগম শিউরে উঠে মেয়ের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে দরূদ পাঠ শুরু করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। 

ফোনের স্পিকার চিরে ভেসে আসে আগ্নেয়াস্ত্রের বিকট শব্দ—‘ঠাস! ঠাস!’ আর তার পরপরই ভেসে আসে একটি তাজা প্রাণের শেষ গোঙানি। এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় একটি হাসিখুশি সংসার। 

আসল অপরাধীকে বাঁচাতে বলির পাঁঠা
টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং তৎকালীন স্থানীয় যুবলীগ নেতা একরামুল হককে হত্যার আগেই সাজানো হয়েছিল এক নির্মম নাটক। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নিকটাত্মীয় ও তাঁর মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য নাজিরপাড়ার একরামকে আড়াল করতেই নামের মিল থাকা টিনের ঘরে বাস করা নির্দোষ একরামুল হককে ‘ইয়াবার গডফাদার’ তকমা দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল—গণমাধ্যমে তাকে অপরাধী হিসেবে দাঁড় করিয়ে মূল অপরাধীদের বাঁচানো।

নির্বাসন ও শ্বাসরুদ্ধকর নজরদারি
হত্যাকাণ্ডের পর সেই ফোনালাপের অডিও ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। তথ্য চাপা দিতে একরামের পরিবারকে একপ্রকার জোর করেই টেকনাফ থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বাধ্য হয়ে স্ত্রী আয়েশা বেগম তাঁর দুই মেয়ে তাহিয়া ও নাহিয়ানকে নিয়ে চট্টগ্রামে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও তাঁদের পিছু ছাড়েনি ভয়াল নজরদারি।

ঘরের বাইরে সার্বক্ষণিক বিশেষ বাহিনীর টহল, সন্তানদের স্কুলে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলের মহড়া এবং ঘরে ঢুকে হুমকি দেওয়া হতো—*‘মেয়েদের নিয়ে বের হবেন না, বেশি নাড়াচাড়া করলে আপনাদেরও ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।’* আইনের আশ্রয় নিতে আইনজীবীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও সিভিল পোশাকের গোয়েন্দাদের ভয়ে কোনো আইনজীবী মামলা লড়তে সাহস পাননি। 

কান্নার অধিকারও কেড়ে নিয়েছিল রাষ্ট্র
স্বজন হারানোর পর মন খুলে কান্নার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল পরিবারটির কাছ থেকে। একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম অভিযোগ করেন, তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ফোনে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন সংবাদমাধ্যম বা মানবাধিকার সংস্থার সামনে মুখ না খুলতে এবং কান্নাকাটি না করতে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিয়ে যাওয়া এবং সঠিক বিচারের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা ছিল কেবল তাঁদের মুখ বন্ধ রাখার কৌশল।

আট বছর পর বিচারে আলোর আশা
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশেষে বিচারহীনতার আঁধার কাটতে শুরু করেছে। দীর্ঘ আট বছর পর সেই রাতের নির্মম ফোনালাপের অডিও রেকর্ড, উচ্ছেদের প্রমাণ ও বছরের পর বছর জমে থাকা চোখের জল নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৌঁছেছেন আয়েশা বেগম।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে এবং আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

পাথরচাপা কষ্ট নিয়ে আয়েশা বেগম বলেন, “আমার স্বামী কোনো ইয়াবা কারবারি ছিলেন না, চক্রান্ত করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। যারা আমার জীবন ছাই করে দিয়েছে, আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যেতে চাই।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।