প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে গাজীপুরের ২৯৩ প্রাথমিক বিদ্যালয়

অনলাইন ডেস্কঃ
২২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৪০ পিএম
শেয়ার করুন:
প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে গাজীপুরের ২৯৩ প্রাথমিক বিদ্যালয়

গাজীপুর জেলার ৭৭৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৯৩টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই পদগুলো শূন্য থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম। বিদ্যালয় পর্যায়ের এই সংকটের মধ্যেই আবার শূন্য হয়ে পড়েছে গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (ডিপিইও) পদটিও। ফলে জেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম স্থবিরতা ও নেতৃত্বহীনতা দেখা দিয়েছে। 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে মোট ৭৭৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে প্রধান শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪৮৩টিতে। বাকি ২৯৩টি বিদ্যালয়ই চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়া। এসব প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের একদিকে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক নথিপত্র সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিয়মিত পাঠদানেও অংশ নিতে হচ্ছে—যা শিক্ষার গুণগত মান ও শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

উপজেলাওয়ারি সংকটের চিত্র:
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে গাজীপুর সদর, কালীগঞ্জ ও শ্রীপুর উপজেলায়। 
গাজীপুর সদর: ১৬২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৩টিতে প্রধান শিক্ষক নেই।
কালীগঞ্জ: ১২৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৩টিতে পদ শূন্য।
শ্রীপুর: ১৫৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬২টিতে নেই প্রধান শিক্ষক।
কাপাসিয়া: ১৭৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৭টিতে পদ শূন্য।
কালিয়াকৈর: ১২২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪২টিতে প্রধান শিক্ষক নেই।
টঙ্গী এলাকা: ১৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬টিতে একই সংকট বিদ্যমান।

বর্তমানে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে (যার মধ্যে ৭৯,৮৬০ জন ছাত্র এবং ৮৯,৮১৭ জন ছাত্রী)। শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদান ব্যাহত হওয়ায় প্রাথমিক স্তর থেকেই অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ক্ষোভ ও হতাশা:
বছরের পর বছর ভারপ্রাপ্ত হিসেবে বাড়তি দায়িত্ব পালন করলেও পদোন্নতি বা অতিরিক্ত কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না শিক্ষকরা। 
কালিয়াকৈর উপজেলার বাসুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মালেক হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি টানা ২৯ বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। অথচ সহকারী শিক্ষকের বেতন-ভাতা পাচ্ছি। আমাদের পদোন্নতি দেওয়ার কথা থাকলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।”

একইভাবে গাজীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হালিমা শামীম বলেন, “দুই বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আছি। একই সঙ্গে ক্লাস এবং স্কুলের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।"

জেলা কার্যালয়েও স্থবিরতা:
মাঠপর্যায়ের পাশাপাশি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেও দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা। গত বৃহস্পতিবার থেকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদটি শূন্য রয়েছে। এখন পর্যন্ত কাউকে স্থায়ী বা অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এতে কার্যালয়ের রুটিন কাজসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। 

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের সহকারী মনিটরিং কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তবে জেলা কর্মকর্তার পদটি শূন্য থাকায় বর্তমানে জেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কাজকর্মে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে।”

সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও অভিভাবকদের দাবি, জেলার প্রাথমিক শিক্ষার মান রক্ষা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দ্রুততম সময়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদটি পূরণ করা জরুরি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।