পৌর চেয়ারম্যান থেকে মহাসচিব, ‘মাননীয় মন্ত্রী’ থেকে ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’- মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

মোঃ রহমতুল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
১৩ আগস্ট, ২০২৬ ৪:১৫ পিএম
শেয়ার করুন:
পৌর চেয়ারম্যান থেকে মহাসচিব, ‘মাননীয় মন্ত্রী’ থেকে ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’- মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পদে আরোহন—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা নানা আন্দোলন-সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার এক উজ্জ্বল দলিল। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য, বিএনপির দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বস্ত কাণ্ডারি, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পদার্পণ—এই প্রবীণ রাজনীতিকের প্রতিটি অধ্যায়ই ঘটনা বহুল। তিনি যেমন রাজপথের বিরোধী দলের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি দক্ষতার সাথে সামলেছেন রাষ্ট্র পরিচালনার নানা গুরুদায়িত্ব।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও কর্মজীবনের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:


১. ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষাজীবন

ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালেই মির্জা ফখরুল রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী মির্জা ফখরুল ছাত্র ইউনিয়নের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কারাবরণ করেন।

২. শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে সফলতার সাথে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরিতে থাকাকালে ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর একান্ত সচিব (PS) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

৩. তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে মির্জা ফখরুল পূর্ণাঙ্গভাবে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়, যার মাধ্যমে তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর শক্ত অবস্থান তৈরি হয়।

৪. সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে ভূমিকা

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মির্জা ফখরুল প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর তিনি গঠিত নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

৫. দলীয় নেতৃত্ব ও সফল মহাসচিব

২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুলকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে তিনি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

২০১১ সালের ২০ মার্চ দলের তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।

দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রবাসে অবস্থানকালীন কঠিন সময়ে দেশে বিএনপির দলীয় সংগঠন ধরে রাখা ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনায় তিনি প্রধান মুখ হিসেবে ভূমিকা রাখেন।

৬. রাজপথের আন্দোলন ও কারাবরণ

বিরোধী দলে থাকাকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে মির্জা ফখরুলকে বারবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। রাজনৈতিক জীবনে তিনি অন্তত সাড়ে ৪ শত দিন কারাগারে কাটিয়েছেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তারসহ অসংখ্য মামলার মুখোমুখি হয়েও তিনি রাজপথের রাজনীতি সচল রেখেছেন।

৭. রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পদার্পণ

সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকারের পৌর প্রধান থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও দলের শীর্ষ পদ সামলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ 'মহামান্য রাষ্ট্রপতি' হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

৮. ব্যক্তিগত জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। এই দম্পতির দুই কন্যা সন্তান রয়েছেন—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।