ভাঙনে বিলীন একের পর এক গ্রাম, বদলে যাচ্ছে ফেনীর মানচিত্র

অনলাইন ডেস্কঃ
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০২ পিএম
শেয়ার করুন:
ভাঙনে বিলীন একের পর এক গ্রাম, বদলে যাচ্ছে ফেনীর মানচিত্র

চলমান বর্ষায় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে ফেনীর নদ-নদীগুলোতে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইতিমধ্যে ছোট ফেনী, মুহুরী, সিলোনিয়া ও কালীদাস পাহালিয়া নদীর তীব্র স্রোতে নদী তীরবর্তী এলাকার হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নদীতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদ, ধসে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো। নদী শাসন ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে অতি দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে অসংখ্য বসতভিটা ও ফসলি জমি।

সোনাগাজী ও দাগনভূঞায় চরম বিপর্যয়

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, ফেনী জেলায় নদী ভাঙনের কবলে পড়ে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলা। বিশেষ করে সোনাগাজীর চরদরবেশ, চরমজলিশপুর ও চরচান্দিয়া এবং দাগনভূঞার মাতুভূঞা ও দাগনভূঞা সদর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিগত কয়েক মাসে প্রবল ভাঙনে শত শত পরিবার সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে হাজার হাজার পরিবার ভাঙন আতঙ্কে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।

ছোট হয়ে আসছে নদীবেষ্টিত সোনাগাজী

অব্যাহত এই ভাঙনে দিনে দিনে আয়তনে ছোট হয়ে আসছে তিন দিক থেকে নদীবেষ্টিত সোনাগাজী উপজেলা। ছোট ফেনী নদীর তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে সোনাগাজীর বেশ কয়েকটি গ্রাম।

হুমকির মুখে থাকা এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • চরমজলিশপুর ইউনিয়ন: চরবদরপুর, কুঠিরহাট, কাটাখিলা ও কালীমন্দির।

  • চরদরবেশ ইউনিয়ন: দক্ষিণ চরদরবেশ, আদর্শ গ্রাম, পশ্চিম চরদরবেশ, কাজীরহাট স্লুইসগেট, আউরারখীল জেলেপাড়া, আলামপুর, তেল্লারঘাট, ইতালি মার্কেট ও ধনীপাড়া।

  • চরচান্দিয়া ইউনিয়ন: সাহেবের ঘাট, মোল্লারচর ও পশ্চিম চরচান্দিয়া।

  • বগদাদিয়া এলাকা: আলমপুর ও আউরারখিল।

  • আমিরাবাদ ইউনিয়ন: পূর্ব সোনাপুর, বাদামতলী ও গুচ্ছগ্রাম।

এসব এলাকার ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। অন্যদিকে, দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের বাগের হাট, রামানন্দপুর, সালামনগর, জেলেপাড়া, তালতলী ও করিমপুরসহ বিভিন্ন স্থানেও বাসিন্দারা চরম নদী ভাঙন আতঙ্কে দিন পার করছেন।

মুছাপুর রেগুলেটর বিলীন হওয়াই প্রধান কারণ

স্থানীয়দের মতে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুছাপুর রেগুলেটরটি ২০২৪ সালের ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়[1]。 এই রেগুলেটরটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে জোয়ারের সময় সরাসরি ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। আবার ভাটার সময় তীব্র স্রোতের তোড়ে নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ধসে যাচ্ছে[2]。

গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি পুনরায় নির্মাণে এখনো কোনো চূড়ান্ত কাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা ফেলা হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। ভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। তারা অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জিওব্যাগ ডাম্পিং, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানান।

সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব মানুষ

পশ্চিম চরদরবেশ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, "হঠাৎ ভাঙনের শিকার হয়ে পরিবার নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। চোখের সামনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে, অথচ আমাদের কিছুই করার নেই। মাত্র দুই মাসের মধ্যে এখানে কয়েক শ মানুষ গৃহহারা হয়েছেন।"

চর গোপালগাঁওয়ের নুর জাহান বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন ও বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সহায়-সম্বল হারিয়ে এখন কোথায় গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করব, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি।"

চরদরবেশ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, "আমার ইউনিয়নের কয়েক শ পরিবার নদীভাঙনে সব হারিয়েছেন। আমার নিজেরই ৪০ থেকে ৫০ জন আত্মীয় গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। তারা অন্যের বাড়ি, সড়কের পাশে ও বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন।"

ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সৈয়দ রবিউল হক শিমুল জানান, চরমজলিশপুর ইউনিয়নের চান্দলা, বিষ্ণুপুর, গোপালগাঁও, চরলক্ষ্মীগঞ্জ, মিয়াজিপাড়া ও তালতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। দ্রুত স্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা না করলে অচিরেই এই অঞ্চল মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

সরকারি উদ্যোগ ও আশ্বাস

নদী ভাঙন রোধে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম জানান, চলতি বর্ষায় ভাঙনকবলিত স্থানগুলোর নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সুরক্ষামূলক কাজ করার জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘বি-স্ট্রং’ নামক একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে এবং এর দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দ্রুতই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হবে।

তিনি আরও জানান, ভেঙে যাওয়া মুছাপুর রেগুলেটরটি পুনর্নির্মাণের প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে[1]। এই রেগুলেটরটির নির্মাণ সম্পন্ন হলে নদী ভাঙনের তীব্রতা ও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ অনেকাংশে কমে আসবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।