টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানি হচ্ছে না গাজায়

অনলাইন ডেস্কঃ
May 25, 2026 - 16:26
টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানি হচ্ছে না গাজায়

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বিষাদের ছায়া। টানা তৃতীয় বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহার প্রধান ঐতিহ্য ও ধর্মীয় রীতি ‘কোরবানি’ পালন করতে পারছেন না গাজার বাসিন্দারা। ইসরায়েলি আগ্রাসন, দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ এবং গবাদি পশুর চরম সংকটে এই উৎসবের আনন্দ এখন ফিলিস্তিনিদের কাছে সুদূর পরাহত।

এক সময়ের পশুপালক এখন নিঃস্ব 
গাজা সিটির বাসিন্দা মাজেন আল-জেরজাউই এক সময় গাজার অন্যতম প্রধান পশুপালক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বছরের এই সময়ে তার খামারে শত শত ভেড়া ও গরুর ডাক শোনা যেত। কিন্তু আজ সেই খামার জনশূন্য। জীবিকার তাগিদে তিনি এখন একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালান এবং সেখানেও তাকে নির্ভর করতে হয় বাইরে থেকে আসা হিমায়িত মাংসের ওপর।

জেরজাউই আক্ষেপ করে বলেন, "বছরের এই সময়ে আমি অন্তত ২০০টি ভেড়া ও গরু বিক্রি করতাম। আজ আমার কাছে একটি পশুও নেই। ইসরায়েল গাজায় জীবন্ত কোনো পশু প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তারা আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে যেন আমরা এখানে সাময়িকভাবে বাস করছি।"

ধ্বংসস্তূপে পরিণত পশুসম্পদ খাত  
গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের ফলে গাজার ৯০ শতাংশেরও বেশি পশুসম্পদ খাত ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরায়েলি হামলা এবং পশুখাদ্য ও কৃষি সরঞ্জামের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থানীয় উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। 

যুদ্ধের আগে গাজায় কোরবানির চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর ৪০ থেকে ৬০ হাজার পশু আমদানি করা হতো। বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, গাজার অন্তত ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল হয় যুদ্ধে মারা গেছে, না হয় খাদ্যাভাবে প্রাণ হারিয়েছে।

আকাশচুম্বী দাম, সাধ্যের বাইরে কোরবানি  
পশুর তীব্র সংকটের কারণে দাম এখন সাধারণ মানুষের কল্পনাতীত। যুদ্ধের আগে যে ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার, বর্তমানে গুটিকয়েক অবশিষ্ট পশুর দাম হাঁকা হচ্ছে প্রায় সাত হাজার ডলার। 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানান, যুদ্ধের আগে গাজায় প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল, যা বর্তমানে কমে মাত্র তিন হাজারে দাঁড়িয়েছে। গরু ও বাছুর তো এখন মেলাই ভার। তিনি বলেন, "পানির কূপগুলো অকেজো হয়ে যাওয়ায় এবং খাদ্যের অভাবে এই খাতটি পুনরুজ্জীবিত করার কোনো পথ খোলা নেই।"

ঈদ যেন এক অচেনা উৎসব  
গাজার সাধারণ মানুষের কাছে ঈদ এখন কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ। স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন, "মনে হচ্ছে আমরা তিন বছর ধরে ঈদ উদযাপন করি না। অনেকে দৈনিক খাবারই জোগাড় করতে পারছেন না, আর মাংস খাওয়া তো অনেকের জন্য এক বছরের বেশি সময় ধরে স্বপ্ন হয়ে আছে।"

ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ইসরায়েল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গাজার সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। পশুপালক, কসাই ও খামারিদের পেশা বন্ধ করে দিয়ে গাজাকে পুরোপুরি পরনির্ভরশীল করে তোলাই এই অবরোধের লক্ষ্য।

টানা তিন বছরের এই বঞ্চনা আর ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে গাজার আকাশে এবারও ঈদের চাঁদ উঠবে, কিন্তু কোরবানি ও উৎসবের চিরচেনা আনন্দ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবেন ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow