মোবাইল কোর্টের অপব্যবহার ও একটি পরিবারের ঘরছাড়ার গল্প
গত ৪ মে সন্ধ্যায় শাহরাস্তির চিতোষী গ্রামে সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী ও তার মা বখাটেদের হাতে শ্লীলতাহানির শিকার হন। স্থানীয় জনতা ও ভুক্তভোগী পরিবার ৫ জন বখাটেকে ধরে ফেলে। পরে পুলিশ এসে চারজনকে থানায় নিয়ে যায়। অভিযুক্তরা এলাকার পরিচিত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।
আইন লঙ্ঘন ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিতর্কিত ভূমিকা
আইন অনুযায়ী, শ্লীলতাহানির মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে নিয়মিত আদালতে হওয়ার কথা। কিন্তু শাহরাস্তির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজিয়া হোসেন ও ওসি মীর মাহবুবুর রহমান আইনকে পাশ কাটিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। ৫ মে ইউএনও তার কার্যালয়ে বসে চার বখাটেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা এবং মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল কোর্ট কেবল ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধ আমলে নিয়ে বিচার করতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে আসামিদের সারারাত থানায় আটকে রেখে পরদিন ইউএনও’র কার্যালয়ে সাজা দেওয়া হয়, যা আইনের চরম অপব্যবহার। এছাড়া শ্লীলতাহানির বিচার করার কোনো এখতিয়ার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেই।
বিচার পাওয়ার পর ভয়াবহ প্রতিহিংসা
প্রশাসনের এই দায়সারা বিচারের পরই শুরু হয় বখাটেদের তাণ্ডব। মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পাওয়ার পরদিনই ভুক্তভোগী পরিবারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। আসবাবপত্র ও গবাদিপশু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, মেয়েটিকে ধর্ষণ ও এসিড মারার হুমকিও দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রাণভয়ে মা-মেয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। ভুক্তভোগী বাবা আক্ষেপ করে বলেন, "বিচার বলতে তো কিছুই পেলাম না, উল্টো সব হারিয়ে এখন পথে পথে ঘুরছি।"
আদালতে ওসির মিথ্যাচার
এই অনিয়মের খবর জানাজানি হলে চাঁদপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহাদাতুল হাসান আল মুরাদ স্বপ্রণোদিত হয়ে শাহরাস্তি থানার ওসিকে তলব করেন। ১২ মে আদালতে হাজির হয়ে ওসি মীর মাহবুবুর রহমান দাবি করেন যে, ইউএনও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েই বিচার করেছেন। তবে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও দোকানদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওসির এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। পুলিশ আসামিদের ধরে থানায় নেওয়ার পরদিন দপ্তরে বসে এই সাজা দেওয়া হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এই ঘটনাকে ‘আইনের শাসন পরিপন্থী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, নিয়মিত আদালতের বিচার্য বিষয়কে জোর করে মোবাইল কোর্টে নেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে পাশ কাটিয়ে একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ার চেষ্টা চলছে, যার ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং ভুক্তভোগীরা আরও বিপদে পড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে শাহরাস্তির এই ঘটনা নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে প্রশাসনের দায় এড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে গৃহহীন পরিবারের আর্তনাদ। আগামী ১৯ মে আদালত এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশ দেবেন বলে জানা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি এখন কেবল প্রশাসনের আশ্বাস নয়, বরং প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও জানমালের নিরাপত্তা চায়।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ