জলঢাকা হতে পারে পর্যটনের শহর

হাসানুজ্জামান সিদ্দিকী হাসান, জলঢাকা প্রতিনিধি, নীলফামারীঃ
May 14, 2026 - 10:48
May 14, 2026 - 10:48
জলঢাকা হতে পারে পর্যটনের শহর

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলা হতে পারে দেশের অন্যতম একটি আধুনিক পর্যটন শহর। এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পর্যটন বিকাশের অপার সম্ভাবনা। স্থানীয়দের দাবি, সঠিক সরকারি পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিলে জলঢাকা কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্রই হবে না, বরং এখান থেকে প্রতি বছর সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব। একইসঙ্গে সৃষ্টি হবে হাজারো বেকার যুবকের কর্মসংস্থান।

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের হাতছানি:
জলঢাকা পৌরসভার দুন্দিবাড়ী হতে কৈমারীর বড়ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত তিস্তার প্রধান সেচ ক্যানেলের দুই ধারে বসার জায়গা ও ফুল-ফলের গাছ লাগিয়ে সৌন্দর্য বর্ধন করা সম্ভব। ক্যানেলের স্বচ্ছ পানিতে ছোট ছোট নৌকার ব্যবস্থা করলে এটি দর্শনার্থীদের জন্য এক অপূর্ব বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এছাড়া বড় তিস্তার স্পার বাঁধ ও শহর রক্ষা বাঁধে বরণিল বৃক্ষরোপণ এবং নদীতে স্পিডবোট ও নৌ-ভ্রমণের ব্যবস্থা করলে পর্যটকদের ঢল নামবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ:
জলঢাকার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ধর্মপাল ইউনিয়নে রয়েছে প্রাচীন 'হাতির কড়াই' এবং মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা পাল বংশীয় রাজা ধর্মপালের বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। খেরকাটি হাজীপাড়া ও শিমুলবাড়ীর চেয়ারম্যান পাড়ায় রয়েছে মোঘল আমলের তৈরি শৈল্পিক কারুকার্যখচিত দুই কাতার বিশিষ্ট মসজিদ। ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় রয়েছে একই আমলের এক কাতারের একটি প্রাচীন মসজিদ। এছাড়া খুটামারা ইউনিয়নের হরিশ চন্দ্র পাঠ এলাকায় রাজা হরিশ চন্দ্রের বাড়ী ও মন্দির সংস্কার করলে তা হয়ে উঠতে পারে অন্যতম দর্শনীয় স্থান। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই অমূল্য সম্পদগুলো আজ বিলুপ্তির পথে।

বিনোদন ও বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা:
পৌরসভার ডাকুরডাঙ্গা এলাকায় একটি নভোথিয়েটার ও চিড়িয়াখানা স্থাপন করার উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। বুড়ি তিস্তার মিলনস্থল শৌলমারীর বানপাড়া হতে কৈমারীর আনছারের হাট পর্যন্ত নদী রক্ষা বাঁধে মিনি রেস্টুরেন্ট, বসার জায়গা ও স্পিডবোটের ব্যবস্থা করলে এলাকাটি প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। গোলনা ইউনিয়নের গুচ্ছ গ্রাম ও সাতজান এলাকায় খাস জমিতে ইকো-পার্ক, শিশু পার্ক এবং শুটিং স্পট করার দাবি দীর্ঘদিনের। এছাড়া বালাগ্রাম ইউনিয়নের আলোর বাজারে ‘রাজার বাগান’ এলাকাটি পিকনিক ও শুটিং স্পট হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক ভিত্তি:
জলঢাকায় বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। কৈমারীতে কোল্ড স্টোরেজ ও অটো রাইস মিল, বালাগ্রামের রূপনগর শিশু পার্ক, শিমুলবাড়ীর গামছা ও লুঙ্গির ফ্যাক্টরি এবং মীরগঞ্জের চটি ও মুড়ি তৈরির কারখানাগুলো স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এছাড়া গোলনা এলাকায় মিনি গার্মেন্টস ও দুন্দিবাড়ী ক্যানেল পাড়ে ‘মুন্নু ইকো-পার্ক’ বিনোদনের চাহিদা মেটাচ্ছে। গোলমুন্ডার সুইচ গেট এলাকাটি প্রাকৃতিক ঝর্ণার মতো রূপ নেওয়ায় সেখানেও পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি ও প্রত্যাশা:
এলাকাবাসীর মতে, শুধুমাত্র সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সিন্ধান্তহীনতার অভাবে জলঢাকার ঐতিহাসিক স্থানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটু নজর দিলে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করলে জলঢাকা হতে পারে উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। এতে একদিকে যেমন এলাকার সুনাম বাড়বে, অন্যদিকে পর্যটন খাত থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারবে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, জলঢাকা পৌরসভা ও ইউনিয়নগুলোর এই সম্ভাব্য স্থানগুলোকে আধুনিকায়ন করে দ্রুত একটি পর্যটনবান্ধব অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow