পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার ‘গুম’ হওয়া গরু ব্যবসায়ীর লাশ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে অপহরণ ও গুমের অভিযোগে নিখোঁজ থাকা এক গরু ব্যবসায়ীর লাশ রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানা সংলগ্ন পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুরে গোদাগাড়ী থানা থেকে আনুমানিক ৫০০ গজ দূরে নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় লাশটি পাওয়া যায়। উদ্ধারস্থলটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নের মিডিল চর এলাকায় অবস্থিত।
নিহত ব্যবসায়ীর নাম আহাদ আলী ওরফে কাজল ওরফে গোলকাজল (৩৪)। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের চাকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত আলতাফ হোসেন ওরফে ফিরোজ। আহাদ আলী পেশায় একজন গরু ব্যবসায়ী ছিলেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২ জানুয়ারি রাত থেকে আহাদ আলী নিখোঁজ ছিলেন। এ ঘটনায় ৮ জানুয়ারি তার স্ত্রী লিসা বেগম (৩০) বাদী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও আটজনসহ মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের অভিযোগ আনা হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় চরবাগডাঙ্গা বাজারে আলম ও নাজমুল হুদার সঙ্গে আহাদ আলীর কথা কাটাকাটি হয়। এর পরদিন ২ জানুয়ারি রাত আনুমানিক সোয়া ৯টার দিকে আহাদের মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তিনি প্রথমে বাড়ি থেকে বের হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
পরে হাসেম আলী নামের এক ব্যক্তি মোটরসাইকেল নিয়ে আহাদের বাড়িতে যান। তিনি জানান, আগের দিনের বিরোধের মীমাংসা হবে এবং চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ওমর আলী এবং জেলা তাঁতী লীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম মেম্বারসহ কয়েকজন আলমের বাড়িতে বসে আছেন। বিষয়টি মীমাংসার আশ্বাসে আহাদ আলী মোটরসাইকেলের পেছনে বসে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি।
মামলার আসামিদের মধ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উঠে আসায় ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে মামলার পর আসামিপক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ অস্বীকার করে। তারা দাবি করেন, ৩ জানুয়ারি গভীর রাতে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের নাড়ুখাকি এলাকায় পদ্মা নদীতে একটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় আহাদ আলী নিখোঁজ হন। তাদের অভিযোগ, যথাযথ তদন্ত ছাড়াই অপহরণ ও গুমের মামলা গ্রহণ করা হয়েছে।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণের অভিযোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আলমকে জেলা পুলিশ শোকজ করে। তিনি ইতোমধ্যে শোকজের জবাব দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এরই মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরে গোদাগাড়ী থানার পাশে পদ্মা নদীতে একটি লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে গোদাগাড়ী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি ও গোদাগাড়ী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করে। যেহেতু ঘটনাস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার আওতাভুক্ত, তাই সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশকে অবহিত করা হয়। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়।
লাশ উদ্ধারের সময় নিহতের ভাই শওকত আলী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তিনি দাবি করেন, তার ভাইকে বাড়ি থেকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে গুম করা হয়েছিল এবং হত্যার পর লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় লাশের শরীরের একাধিক স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। এছাড়া নিহতের কয়েকটি দাঁত ভাঙা অবস্থায় ছিল বলেও তারা জানিয়েছেন। এসব আলামত হত্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে ধারণা করছেন নিহতের স্বজনরা।
তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ওসি নূরে আলম। তিনি বলেন, “সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তদন্ত চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, আহাদ আলীকে গুমের মামলায় ইতোমধ্যে কামরুজ্জামান বাচ্চু নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চরম উত্তেজনা ও শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা।
What's Your Reaction?
সেলিম সানোয়ার পলাশ, গোদাগাড়ী প্রতিনিধি, রাজশাহীঃ