শোকেরও ছুটি নেই

অনলাইন ডেস্কঃ
২২ জুলাই, ২০২৬ ১২:৪০ পিএম
শেয়ার করুন:
শোকেরও ছুটি নেই

বাবার আকস্মিক মৃত্যুর গভীর শোক বুকে চেপে এক হাতে বই আর অন্য হাতে দায়িত্ব—এমনই এক কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন বাগেরহাটের তরুণ ইকন। গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান তার বাবা ইসরাফিল দাড়িয়া (৪৬)। বিকেলে বাবার দাফন সম্পন্ন করার পর, ইকনকে রাতেই বসতে হয়েছে বাগেরহাট কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তার দায়িত্বে। আর সেখানে বসে পড়াশোনা শেষ করে, পরদিন সকালেই তাকে অংশ নিতে হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষায়। 

এই হৃদয়বিদারক ঘটনার খবর গণমাধ্যমে আসার পর তা নাড়া দিয়েছে সাধারণ মানুষের বিবেককে। পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তাকর্মীদের কর্মঘণ্টা, পারিশ্রমিক ও ছুটির মতো বিষয়গুলোও নতুন করে সামনে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগ ও মানুষের সহানুভূতি
ইকনের এই সংগ্রামের চিত্র গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই তার পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাগেরহাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিষয়টি নজরে আসার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে বাগেরহাট কৃষি ব্যাংকে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং ইকনের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

একটি পরিবারের কঠিন লড়াই
ইকনের পরিবার মূলত গোপালগঞ্জের বাসিন্দা। তার দাদা বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডে গাড়িচালকের চাকরি করার সুবাদে এই শহরে চলে আসেন। অবসর গ্রহণের পর তার দাদা দেশের বাড়িতে ফিরে গেলেও, জীবিকার তাগিদে বাবা ইসরাফিল দাড়িয়া বাগেরহাটেই থেকে যান। তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন। বর্তমানে মা এবং মানসিক ভারসাম্যহীন এক ভাইকে নিয়ে জেলা শহরের ৩ হাজার ৫০০ টাকার একটি ভাড়া বাসায় চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে দিনাতিপাত করছে পরিবারটি।

নিরাপত্তাকর্মীদের অধিকারের প্রশ্ন
ইকনের মতো বহু তরুণ ও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন বেসরকারি সিকিউরিটি এজেন্সির অধীনে ব্যাংক বা করপোরেট অফিসগুলোতে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু ব্যাংক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করলেও, তাদের বেতন আসে এজেন্সির মাধ্যমে। অভিযোগ রয়েছে, এই পারিশ্রমিকের একটি বড় অংশ কেটে রাখে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো। একই সঙ্গে অধিকাংশ কর্মীর ডিউটির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না। কখনো দিনে, কখনো টানা রাতে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। ইকনের মতো যারা খণ্ডকালীন (পার্টটাইম) কাজ করেন, তাদের মূলত রাতের বেলা বুথ পাহারা দিতে হয়।

কর্তব্য ও বাস্তবতার টানাপোড়েন
বাবার মৃত্যুর খবর শুনে বাগেরহাট কৃষি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা ইকনের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তার বাবার জানাজায়ও অংশ নেন। তিনি ইকনকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, শারীরিক বা মানসিকভাবে কোনো সমস্যা হলে রাতে ডিউটিতে না এলেও চলবে। কিন্তু সংসারের বাস্তবতায় এবং নিজের দায়িত্ববোধ থেকে ইকন রাতে এটিএম বুথে ডিউটি করতে যান। সেখানেই বই হাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কালবেলার জেলা প্রতিনিধি তার এই জীবনসংগ্রামের কথা জানতে পারেন। 

ইকনের এই শোক ও লড়াইয়ের গল্প এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং হাজারো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।