১০ সন্তানের বাবা-মা, তবু জোটে না দুবেলা খাবার; ভাঙা ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন দম্পতি

অনলাইন ডেস্কঃ
১৮ জুলাই, ২০২৬ ৩:০৯ পিএম
শেয়ার করুন:
১০ সন্তানের বাবা-মা, তবু জোটে না দুবেলা খাবার; ভাঙা ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন দম্পতি

১০ সন্তানের জনক-জননী হয়েও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চরম অবহেলা আর একাকীত্বের মুখোমুখি হয়েছেন এক প্রবীণ দম্পতি। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের বানিয়াগাঁতী গ্রামে ৯০ বছর বয়সী আছাব আলী ও তার ৮০ বছর বয়সী স্ত্রী সালেকা বেগম এখন ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। সন্তানদের কেউ দায়িত্ব না নেওয়ায় জরাজীর্ণ এক ভাঙা ঘরে ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাটছে তাদের দিন।

১০ সন্তান থেকেও মেলেনি আশ্রয়
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আছাব আলী ও সালেকা দম্পতির পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়েসহ মোট ১০টি সন্তান রয়েছে। একসময় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সন্তানদের বড় করেছেন আছাব আলী। সন্তানদের লেখাপড়া, বিয়ে এবং সবার আলাদা সংসার গুছিয়ে দিতে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ও শ্রম বিলিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ জীবনের শেষ বেলায় এসে কোনো সন্তানের কাছ থেকেই ন্যূনতম সহায়তা বা যত্ন পাচ্ছেন না এই দম্পতি। দুবেলা খাবারের জন্য এখন তাদের চেয়ে থাকতে হয় প্রতিবেশীদের করুণার দিকে।

জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবনযাপন
বয়সের ভারে ন্যুব্জ আছাব আলী প্রায় সম্পূর্ণ চলনশক্তিহীন। নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকুও তার নেই। স্ত্রী সালেকা বেগম নিজেও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন। কিন্তু নিজের অসুস্থতা ভুলে তিনিই দিন-রাত স্বামীর সেবা করে যাচ্ছেন। কখনো স্বামীকে ধরে বাইরে নিয়ে যান, আবার কখনো এক মুঠো অন্নের সন্ধানে প্রতিবেশীদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দাঁড়ান।

তাদের বসবাসের ঘরটির অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। জরাজীর্ণ টিনের চাল আর ফুটো হয়ে যাওয়া বেড়ার ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাদের বসবাস। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। ঘরে নেই কোনো ভালো আসবাবপত্র বা শৌচাগার। একটি খাট কেনার সামর্থ্য না থাকায় বাঁশের তৈরি মাচার ওপর চট বিছিয়ে রাত কাটাতে হয় এই প্রবীণ দম্পতিকে। 

প্রতিবেশীদের ক্ষোভ ও সহমর্মিতা
স্থানীয় বাসিন্দা জুরান আলী আক্ষেপ করে বলেন, "এতগুলো সন্তানকে তারা অনেক কষ্টে মানুষ করেছেন। অথচ আজ কেউ তাদের দায়িত্ব নিচ্ছে না। সামান্য খাবারের জন্য তাদের কষ্ট পেতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।" 

প্রতিবেশী মরিয়ম বেগম ও কামাল শেখ জানান, তারা সাধ্যমতো এই দম্পতিকে সাহায্য করার চেষ্টা করেন। তবে এভাবে একটি জীবন চলতে পারে না। যেখানে সন্তানদের ভালোবাসা ও যত্নে থাকার কথা ছিল, সেখানে তারা চরম অবহেলার শিকার হচ্ছেন।

সহায়তার উদ্যোগ
অসহায় এই দম্পতির কষ্ট লাঘবে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় কিছু সমাজকর্মী। সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস জানান, সকলের সহযোগিতায় অন্তত ৭০ হাজার টাকা সংগ্রহের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে আছাব আলীর জন্য একটি হুইলচেয়ার, প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী এবং কিছু জরুরি সামগ্রীর ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সামান্য সহায়তাই এই প্রবীণ দম্পতির জীবনের শেষ দিনগুলোকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

ভদ্রঘাট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সোহাগ মণ্ডল জানান, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই দম্পতিকে বয়স্ক ভাতার কার্ড দেওয়া হয়েছে এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও নিয়মিত সাহায্য করা হয়। তবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "১০ সন্তান থাকার পরও শেষ বয়সে বাবা-মায়ের এই করুণ দশা মেনে নেওয়া কঠিন। সরকারি ভাতার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক ব্যক্তিরা এগিয়ে আসলে তারা অন্তত জীবনের শেষ সময়টুকু সম্মান ও শান্তিতে কাটাতে পারবেন।"

অশ্রুসিক্ত চোখে আকুল আবেদন জানিয়ে সালেকা বেগম বলেন, "আমরা আর কিছু চাই না বাবা। শুধু দুবেলা ভাত খেয়ে, একটু শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটাতে চাই।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।