টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে লণ্ডভণ্ড রোয়াংছড়ি: ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, দেবতাকুম বন্ধ ঘোষণা

সাথোয়াই অং মারমা, রোয়াংছড়ি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
১৮ জুলাই, ২০২৬ ৫:০৪ পিএম
শেয়ার করুন:
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে লণ্ডভণ্ড রোয়াংছড়ি: ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, দেবতাকুম বন্ধ ঘোষণা

বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে টানা কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের তীব্র আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। অবিরাম বৃষ্টির ফলে তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ, ধসে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্থানীয় অবকাঠামো। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে গ্রামীণ পথঘাট ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার হাজার হাজার মানুষ।

গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ১নং রোয়াংছড়ি, ২নং তারাছা, ৩নং আলেক্ষ্যং এবং ৪নং নোয়াপতং ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে রোয়াংছড়ি সদর থেকে কচ্ছপতলি পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন গ্রামীণ রাস্তাঘাট ঢলের তোড়ে ভেঙে গেছে। একাধিক কালভার্ট, সেতুর সংযোগ সড়ক এবং সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি অতীতের অনেক দুর্যোগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। মাঠজুড়ে থাকা আমন ধান, সবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল পানিতে তলিয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। চোখের সামনে মাসের পর মাস করা হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল হারিয়ে কৃষকেরা এখন দিশেহারা। দীর্ঘমেয়াদে এই ক্ষতির প্রভাব স্থানীয় কৃষি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচামাল ব্যবসায়ী মো. জাফর আলম বলেন, "টানা বৃষ্টির কারণে এবার আমার বিপুল লোকসান হয়েছে। বৃষ্টির আগে চুক্তি করে কিনে রাখা আমবাগানগুলো সব নষ্ট হয়ে গেছে। প্রচুর আম ঝরে পড়েছে, যা মাটিতে পড়ে নষ্ট হওয়ায় আর বিক্রি করা যাবে না। এতে আমার লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হলো।"

যোগাযোগের বেহাল দশা নিয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য নাংফ্রা খুমী জানান, বান্দরবান-রুমা সড়ক থেকে সংযোগ সড়ক হয়ে অংতং পাড়া ও ক্যছালং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যাওয়ার রাস্তাটি সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। এটি তারাছা ইউনিয়নের ৬টি খুমী পাড়া এবং ৩টি ম্রো পাড়ার বাসিন্দাদের যাতায়াতের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ ছিল। তিনি বলেন, "সড়কটি মেরামতের জন্য বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সড়কটি সংস্কারের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আমরা আশাবাদী, কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে এলাকাবাসীর মুখে হাসি ফোটাবে।"

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে রোয়াংছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটন স্পট ‘দেবতাকুম’-এ পর্যটকদের যাতায়াত আগামী ২০ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন। রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাজমিন আলম তুলি স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়েছে। 

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ এবং কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।