নেত্রকোনায় বখাটেদের উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় স্কুলছাত্রীর মাকে পিটিয়ে জখম

নেত্রকোনা প্রতিনিধিঃ
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১:০৩ পিএম
শেয়ার করুন:
নেত্রকোনায় বখাটেদের উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় স্কুলছাত্রীর মাকে পিটিয়ে জখম

নেত্রকোনা সদর উপজেলার মৌগাতি ইউনিয়নের চুচুয়া গ্রামে দুই স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় জেসমিন বেগম (৩৮) নামের এক সংগ্রামী মাকে নৃশংসভাবে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। বখাটেদের অব্যাহত অত্যাচার, হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারটি। গুরুতর আহত অবস্থায় জেসমিন বেগম বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্থানীয় ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, জেসমিন বেগম পেশায় একজন ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ী। শাড়ি ও অন্যান্য কাপড় বিক্রি করে তিনি দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চালান। তার স্বামী খোঁজখবর না রাখায় দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি নিজ বাড়িতেই বসবাস করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেশী মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে মো. কুদ্দুস মিয়া (৩২), মো. রবিন মিয়া (২০) এবং তাদের আত্মীয় মিনা আক্তার (৩৬) দীর্ঘদিন ধরে জেসমিন বেগমের স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়েকে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে নানাভাবে উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। 

পরিবারটি এর প্রতিবাদ করলে বখাটেরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাদের ওপর নানামুখী মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন শুরু করে। অতিষ্ঠ করতে বখাটেরা প্রায়ই রাতে জেসমিন বেগমের বাড়ির চালে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করত, ঘরের পানির টিউবওয়েলের যন্ত্রাংশ খুলে নিত এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দরজায় তালা মেরে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখত।

সর্বশেষ গত ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করার জেরে বখাটেরা ক্ষিপ্ত হয়ে জেসমিন বেগমের ওপর চড়াও হয়। ভুক্তভোগীর ভাই আলাউদ্দিন জানান, অভিযুক্ত রবিন ও কুদ্দুস বাঁশ ও ইট দিয়ে জেসমিন বেগমের ওপর নৃশংস হামলা চালায়। বাঁশের আঘাতে তার নাক মারাত্মকভাবে ফেটে যায় এবং ইটের আঘাতে তিনি রক্তাক্ত জখম হন। ঘটনার পর বৃষ্টি উপেক্ষা করে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানেও তার নাক ও চোখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে বলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জানা গেছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, এর আগেও বখাটেদের হাত থেকে বাঁচতে তারা একাধিকবার থানায় লিখিত অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। ভাই আলাউদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, “ঘটনার সময় ৯৯৯-এ কল করে পুলিশ ডাকলেও তারা এসে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো পুলিশের উপস্থিতিতেই অভিযুক্তরা আমাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে গেছে।”

এদিকে, হামলার সময় বখাটেদের ঔদ্ধত্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘বাংলাদেশ নাগরিক পার্টি’র কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম রহমানের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযুক্তরা লাঠি হাতে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে। তারা লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। ঘটনার সত্যতা যাচাই করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জেসমিন বেগম ও তার পরিবার প্রশাসনের কাছে জীবনের নিরাপত্তা এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে জেসমিন বেগম বলেন, “আমরা শুধু স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাই। আমার দুই মেয়ে যেন নির্ভয়ে আবার তাদের পড়ার টেবিলে ফিরে যেতে পারে, সরকারের কাছে আমার এই একটাই দাবি।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।