বিসিএসে প্রথম নেত্রকোনার তানভীর

অনলাইন ডেস্কঃ
৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০৬ পিএম
শেয়ার করুন:
বিসিএসে প্রথম নেত্রকোনার তানভীর

অঢেল অর্থসম্পদ বা চাকচিক্য নয়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমই যে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি—তা আবারও প্রমাণ করলেন নেত্রকোনার তরুণ তানভীর রহমান[1][2]। সদ্য প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষার ফলাফলে পররাষ্ট্র (ফরেন) ক্যাডারে দেশসেরা (প্রথম স্থান) হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি[1][3]। প্রথম সুযোগেই তাঁর এমন ঐতিহাসিক সাফল্যে পরিবার, স্বজন ও নিজ জেলাজুড়ে বইছে আনন্দের জোয়ার[1][2]।

পারিবারিক পরিচয় ও আবহ:
তানভীর রহমান নেত্রকোনা সদর উপজেলার ৯ নম্বর চল্লিশা ইউনিয়নের রায়দুম বাগড়া গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠেছেন[1][4]। তাঁর বাবা আবদুর রহমান নেত্রকোনার শামছুদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মা রিনা পারভীন একজন গৃহিণী[1][5]। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তানভীর সবার বড়[1]। তাঁর মেজো বোন আফসানা রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাস্ট) গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ছোট বোন নুজহাত-ই-রহমান নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন[1]।

মেধাদীপ্ত শিক্ষাজীবন:
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভীষণ একনিষ্ঠ ছিলেন তানভীর[1][2]। টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি এবং ২০১৯ সালে এইচএসসি—উভয় পরীক্ষাতেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন[1][2]। এরপর দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগে ভর্তি হন[1][3]। ২০২৫ সালে বুয়েট থেকে সফলতার সঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি[1][3]।

কর্মব্যস্ততার মাঝে প্রথমবারেই সাফল্য:
স্নাতক শেষ করার পরপরই ২০২৫ সালের ১ জুন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন তানভীর[1][3]। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার ব্যস্ত সূচির মধ্যেও তিনি নিয়মিত বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে যান[2]। সুশৃঙ্খল সময় ব্যবস্থাপনা ও একাগ্রতার মাধ্যমে প্রথমবার পরীক্ষা দিয়েই তিনি অর্জন করেন দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ক্যাডারে প্রথম হওয়ার বিরল গৌরব[1][2]।

খেলার মাঠেও সমান পারদর্শী:
কেবল পড়াশোনার টেবিলেই নয়, শৈশব থেকেই খেলাধুলার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল তানভীরের[1][2]। বিশেষ করে ফুটবল ও ক্রিকেটে তিনি সমান পারদর্শী[1]। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে যখন খেলেন, তখন তাঁর উচ্চতা ছিল মাত্র ৪ ফুটের কিছু বেশি। সবচেয়ে ছোট খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেও দেখিয়েছেন অসামান্য ক্রীড়ানৈপুণ্য। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন টুর্নামেন্ট ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তানভীরের ঝুলিতে জমা হয়েছে অর্ধশতাধিক পুরস্কার।

গর্বিত বাবার আদর্শ ও সততার বার্তা:
ছেলের এই ঐতিহাসিক সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা আবদুর রহমান মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “এটি আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবানি ও রহমত[1]। মেধাতালিকায় প্রথম হওয়াটা আমাদের পুরো পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের। তানভীরের একটা বড় গুণ হলো, সে কখনো অতি-মূল্যায়ন বা ওভার-প্রেডিকশন করে না; সব সময় পরিমিত ও প্রাসঙ্গিক কথা বলে। ক্যাডেট লাইফের সুশৃঙ্খল জীবনযাপন তাকে এই অবস্থানে আসতে অনেক সাহায্য করেছে।”

দীর্ঘ কর্মজীবনে সততাকে আঁকড়ে থাকা এই শিক্ষক বাবার প্রত্যাশা, তাঁর সন্তানও যেন সততার পথে অবিচল থাকে। তিনি বলেন, “আমি সারাজীবন সততার সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছি, কখনো অসৎ পথের চিন্তা করিনি। আজ আমি ছেলের জন্য গর্বিত। তানভীরের প্রতি আমার একটাই দাবি থাকবে—সে যেন রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্ব যোগ্যতা, দক্ষতা ও শতভাগ সততার সঙ্গে পালন করে। আমাদের যা আছে তাতেই আমরা সন্তুষ্ট, আমি তাঁর কাছ থেকে অন্যায় কোনো কিছু আশা করি না।”

অনুপ্রেরণার প্রতীক তানভীর:
তানভীরের প্রতিবেশী সৈয়দ শামসুল হক জানান, “তানভীর প্রমাণ করেছেন যে বড় স্বপ্ন পূরণে অঢেল অর্থের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন তীব্র ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম[2]। আমরা আশা করি, দেশের পররাষ্ট্র সেবায় দায়িত্ব পালন করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবেন[2]।”

তানভীরের এই গৌরবময় সাফল্যে শামছুদ্দিন খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং তাঁর নিজ গ্রামের সাধারণ মানুষ মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ উদযাপন করছেন[4]। বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করতে তানভীর রহমান এখন নিজেকে প্রস্তুত করছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।