জাতীয়তাবাদের অটল দুর্গ চাঁদপুর: তারেক রহমানকে বরণে প্রস্তুত মেঘনাপাড়ের জনপদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে চাঁদপুর জেলার নাম এক অনন্য গৌরবের অধিকারী। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সূচনালগ্ন থেকেই এই জেলা দলটির অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ চার দশক ধরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও দর্শনকে বুকে ধারণ করে চাঁদপুরের মানুষ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে তুলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদপুরে বিএনপির ভিত্তি কেবল ভোটের হিসেবে নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত আদর্শিক আন্দোলনের প্রতীক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিএনপির সবচেয়ে সুসংগঠিত সাংগঠনিক শক্তি চাঁদপুরে বিদ্যমান, যা দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য বড় একটি শক্তি।
উন্নয়ন ও অগ্রগতির সোনালী সময়
বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে (১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬) চাঁদপুরের অবকাঠামো, শিক্ষা এবং অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে নদী বন্দর সম্প্রসারণ ও কৃষি খাতের উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। বিআইডিএস-এর তথ্যমতে, সেই সময়ে চাঁদপুরের কৃষি ও মৎস্য খাতের প্রবৃদ্ধি জাতীয় গড়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি ছিল। অর্থনীতিবিদ ড. আহমেদ মুশতাক রাজা চৌধুরীর মতে, মেঘনা-পদ্মা বিধৌত এই জনপদের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে বিএনপির উন্নয়ন দর্শনের এক নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে।
রক্ত ও ত্যাগের মহিমান্বিত ইতিহাস
তবে চাঁদপুরের এই রাজনৈতিক পথচলা মসৃণ ছিল না। বিগত দীর্ঘ সময় ধরে চাঁদপুর জাতীয়তাবাদী পরিবারকে অবর্ণনীয় জুলুম ও নির্যাতনের মোকাবিলা করতে হয়েছে। ২০০৮ সালের পর তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে এ জেলার দুই বীর সন্তান প্রাণ হারান। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, ২০০৭ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে এ জেলার ৪৩০ জনেরও বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা দেওয়া হয় এবং অসংখ্য নেতাকর্মী দীর্ঘ কারাবাস ভোগ করেন।
বিশেষ করে, তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা আবদুস সাত্তার পাটোয়ারীর ওপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনাটি ছিল সভ্য সমাজের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। তার হাত ভেঙে দেওয়ার পরও ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল—এমন নিষ্ঠুরতা আন্তর্জাতিক মহলেও তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছিল। তবে এই রক্তচক্ষু ও শারীরিক নিগ্রহ চাঁদপুরের জাতীয়তাবাদী শক্তিকে দমাতে পারেনি, বরং তাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে।
নির্বাচনী সাফল্যের পরিসংখ্যান
নির্বাচনী পরিসংখ্যানেও চাঁদপুরের মানুষের অবিচল আস্থার প্রতিফলন দেখা যায়। ১৯৯১ থেকে শুরু করে ২০০১ এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে এই জেলার প্রায় প্রতিটি আসনে বিএনপি প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, চাঁদপুরের কৃষি ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন গভীরভাবে মিশে আছে।
তারেক রহমানের সফর: এক নতুন দিগন্তের সূচনা
আজ ১৬ মে ২০২৬, বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চাঁদপুর সফরকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় বইছে উৎসবের আমেজ। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশের মাটিতে ফেরার পর তার এই সফরকে চাঁদপুরের মানুষ দেখছে ‘আবেগের পুনর্মিলন’ হিসেবে।
এই সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই অংশ নেবেন না, বরং নদী ভাঙন কবলিত চাঁদপুর সদর ও হাইমচরের মানুষের দুঃখ-দুর্দশাও সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন। গত এক দশকে মেঘনার ভাঙনে প্রায় ২৩০০ হেক্টর জমি বিলীন হয়েছে এবং ৪৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মৎস্যজীবীদের অধিকার রক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের মতো অমীমাংসিত সমস্যাগুলো নিয়ে তারেক রহমানের এই সফর নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
উপসংহার
চাঁদপুরের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা ভয়ভীতি বা প্রলোভনে নত হওয়ার নয়। রক্ত, ঘাম আর ত্যাগের বিনিময়ে তারা জাতীয়তাবাদী আদর্শকে টিকিয়ে রেখেছে। আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে চাঁদপুর কেবল একটি রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, বরং গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের এক নতুন বার্তা নিয়ে দেশবাসীর সামনে হাজির হয়েছে। মেঘনা পাড়ের এই জনপদ হয়ে উঠেছে জাতীয়তাবাদের এক চিরন্তন অভয় আশ্রম।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ