ভয় ধরানো খুনের তদন্তেও ‘ভয়’

অনলাইন ডেস্কঃ
May 15, 2026 - 10:55
ভয় ধরানো খুনের তদন্তেও ‘ভয়’

পুরান ঢাকার জনাকীর্ণ জজকোর্ট এলাকা। উল্টো দিকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল। চিরচেনা ভিড় আর কর্মব্যস্ততার মাঝেই গত বছরের ১০ নভেম্বর সকালে ঘটে যায় এক রুদ্ধশ্বাস হত্যাকাণ্ড। শত শত মানুষের চোখের সামনে সিনেমার কায়দায় এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ৫৫ বছর বয়সী তারিক সাইফ মামুনকে। কয়েক সেকেন্ডের এই তাণ্ডব চালিয়ে খুনিরা বীরদর্পে চলে গেলেও সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে যায় গভীর আতঙ্ক।

সেই রোমহর্ষক ঘটনার পর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে খুনে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি হয়েছিল, সেই খুনের তদন্তেই এখন যেন ভর করেছে এক অজানা ‘ভয়’। বিচারের প্রাথমিক ধাপ অর্থাৎ চার্জশিট দেওয়ার কাজও শেষ করতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কর্মকাণ্ডে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা, উঠেছে নানা প্রশ্ন।

ছয় মাসে চার আলোচিত খুন
শুধু মামুন হত্যাকাণ্ডই নয়, গত নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীতে এমন আরও তিনটি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটেছে। জনসমক্ষে গুলি করে হত্যার এই ধরনটি জননিরাপত্তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। 

১৭ নভেম্বর পল্লবীতে দোকানের ভেতর ঢুকে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করে তিন মুখোশধারী। গত ৭ জানুয়ারি কারওয়ান বাজারে প্রাণ হারান স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির। আর ২৯ এপ্রিল নিউমার্কেট এলাকায় একইভাবে প্রাণ হারান আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। এসব ঘটনায় পুলিশ কিছু মাঠ পর্যায়ের অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেও পর্দার আড়ালে থাকা ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা মূল পরিকল্পনাকারীরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পরিসংখ্যান কী বলছে?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গত বছরের নভেম্বর থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসে রাজধানীতে মোট ১২৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নভেম্বরে ২৭টি, ডিসেম্বরে ২০টি, জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৫টি এবং এপ্রিলে ১৭টি খুনের ঘটনা ঘটে। তবে অপরাধ জগতের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক নেতাদের এই চারটি হত্যাকাণ্ড পুরো শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

তদন্তের আড়ালে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ছায়া
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব হত্যাকাণ্ডের শেকড় অনেক গভীরে। শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন হত্যার নেপথ্যে উঠে এসেছে পলাতক সন্ত্রাসী ‘ভাইগ্না রনি’র নাম, যিনি বর্তমানে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক প্রভাবশালী ডনের ছত্রছায়ায় অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন। গ্রেপ্তার হওয়া শুটাররা জানিয়েছে, মাত্র দুই লাখ টাকার বিনিময়ে তারা এই মিশন শেষ করেছে। 

অন্যদিকে, পল্লবীতে যুবদল নেতা কিবরিয়া হত্যার নির্দেশ এসেছে দেশের বাইরে থেকে। এই খুনের নেপথ্যে বিদেশে পলাতক মফিজুর রহমান মামুনের সম্পৃক্ততা মিলেছে। একইভাবে মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা হয়েছে মালয়েশিয়ায় বসে, যেখানে অন্তত ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে কিলিং মিশন পরিচালনা করে সন্ত্রাসী ‘দাদা বিনাশ’। 

কেন এই স্থবিরতা?
আলোচিত এই মামলাগুলোর তদন্তভার এখন ডিবি পুলিশের হাতে। তবে অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া বা মূল আসামিদের হদিস না পাওয়ার অজুহাতে তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারগুলো এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। মামুন বা কিবরিয়ার স্বজনরা তো বিচার পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, অন্য অনেক মামলার মতো এই ফাইলগুলোও হয়তো ধুলোর স্তূপে চাপা পড়ে যাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে আসায় অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ঘাটতি রয়েছে। মূলত রাজনৈতিক প্রশ্রয় এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণেই তদন্তের আলো মূলহোতা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।"

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, তারা কাজ করছেন এবং আসামিদের ‘ছকের মধ্যে’ আনা হয়েছে। তবে জনমনে প্রশ্ন একটাই—প্রকাশ্যে দিনের আলোয় যারা প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, তারা কি তবে আইনের চেয়েও শক্তিশালী? এই তদন্তের ধীরগতি কি বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই আরও উসকে দিচ্ছে না? 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow