বেইজিংয়ে ট্রাম্পের রাজকীয় অভ্যর্থনা: আলোচনায় বাণিজ্য সংঘাত ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি

অনলাইন ডেস্কঃ
May 14, 2026 - 10:57
বেইজিংয়ে ট্রাম্পের রাজকীয় অভ্যর্থনা: আলোচনায় বাণিজ্য সংঘাত ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি

এক বর্ণাঢ্য ও সুপরিকল্পিত আয়োজনের মধ্য দিয়ে বেইজিংয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। বুধবার স্থানীয় সময় গোধূলি লগ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ থেকে নামার পর তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও সামরিক ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। দুই দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরের মূল লক্ষ্য হচ্ছে চীনের বিশাল বাজারকে মার্কিন ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত করা এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে টালমাটাল অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু বড় অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করা।

সঙ্গী হিসেবে শীর্ষ ব্যবসায়ীরা:
ট্রাম্পের এই সফরে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে প্রযুক্তি ও ব্যবসা। তার সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন প্রযুক্তি জায়ান্ট এনভিডিয়ার (Nvidia) প্রধান জেনসেন হুয়াং এবং টেসলা (Tesla) ও এক্স-এর প্রধান ইলন মাস্কের মতো বিশ্বখ্যাত উদ্যোক্তারা। এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো চীনে তাদের শক্তিশালী এআই চিপ বিক্রির অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাম্প তার নিজের সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এক পোস্টে লিখেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অনুরোধ করবেন যেন এই ‘মেধাবী মানুষগুলো’ চীনে তাদের দক্ষতা ও কারিশমা দেখানোর সুযোগ পান। এটিই তার সফরের অন্যতম প্রধান দাবি বলে মনে করা হচ্ছে।

বাণিজ্য ঘাটতি ও শুল্ক বিরতি:
ট্রাম্প বেইজিং পৌঁছানোর আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে মার্কিন বাণিজ্য আলোচক স্কট বেসেন্ট চীনা ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেং-এর সাথে তিন ঘণ্টা ব্যাপী এক ‘গঠনমূলক’ বৈঠক করেছেন। দুই দেশই গত বছরের অক্টোবরে হওয়া শুল্ক বিরতি চুক্তিটি বজায় রাখতে আগ্রহী। ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হলো বোয়িং বিমান, কৃষিপণ্য এবং জ্বালানি বিক্রির মাধ্যমে চীনের সাথে তাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা। এর বিনিময়ে বেইজিং চাইছে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হোক।

ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যু:
বাণিজ্যের পাশাপাশি আলোচনার টেবিলে বড় জায়গা জুড়ে থাকবে ইরান ও তাইওয়ান ইস্যু। তেহরানকে একটি কার্যকর শান্তি চুক্তিতে রাজি করাতে বেইজিং যাতে বড় ভূমিকা পালন করে, সেই প্রত্যাশা করছে মার্কিন প্রশাসন। অন্যদিকে, তাইওয়ানে ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ নিয়ে চীন তাদের কঠোর অবস্থানের কথা পুনরায় ব্যক্ত করেছে। আইনগতভাবে তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সরঞ্জাম দিতে ওয়াশিংটন বাধ্য থাকলেও, এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না কূটনৈতিক মহল।

চাপের মুখে ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাল:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আলোচনায় ট্রাম্প কিছুটা চ্যালেঞ্জিং অবস্থানে রয়েছেন। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচনে পরাজয়ের শঙ্কা, অন্যদিকে আদালতের নির্দেশে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত হওয়া—সব মিলিয়ে এই সফর থেকে একটি বড় কোনো অর্জন ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জরুরি। বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘উসাওয়া অ্যাডভাইজরি’র সিইও লিউ কিয়ান বলেন, "এই মুহূর্তে চীনের চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনেরই এই বৈঠকটি বেশি প্রয়োজন, যাতে তারা মার্কিন ভোটারদের দেখাতে পারে যে তারা বড় কোনো চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছেন।"

ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
গ্রেট হল অব দ্য পিপলে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা, ৬০০ বছরের পুরোনো টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন এবং বর্ণাঢ্য নৈশভোজের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত রসায়ন আবারও বিশ্ববাসীর নজর কাড়বে। বেইজিংয়ের সাধারণ মানুষের মাঝে এই সফর নিয়ে আশা ও সন্দেহ দুই-ই থাকলেও, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন এই দুই বিশ্ব নেতার সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলে আছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow