হামের প্রকোপে দিশেহারা পরিবার: চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বাড়ছে ঋণের বোঝা

অনলাইন ডেস্কঃ
May 14, 2026 - 11:03
হামের প্রকোপে দিশেহারা পরিবার: চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বাড়ছে ঋণের বোঝা

এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন ক্লান্ত মা-বাবা। একদিকে সন্তানের প্রাণের শঙ্কা, অন্যদিকে চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয়—এই দ্বিমুখী সংকটে পিষ্ট হচ্ছে দেশের হাজারো সাধারণ পরিবার। দেশে হামের ভয়াবহ প্রকোপ কেবল শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিই বাড়ায়নি, বরং প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে ঠেলে দিচ্ছে চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে।

নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার, রুদ্ধ উপার্জনের পথ
পিরোজপুরের জাকির হোসেনের (ছদ্মনাম) গল্পটি আজ দেশের বহু মা-বাবার প্রতিচ্ছবি। গত তিন মাস ধরে অসুস্থ এক বছরের ছেলেকে নিয়ে পিরোজপুর, বরিশাল, খুলনা ও ঢাকা—শহরের পর শহর চষে বেড়িয়েছেন তিনি। কখনো নিউমোনিয়া, কখনো রক্তস্বল্পতা, আর সবশেষে ধরা পড়েছে হামের সংক্রমণ। সন্তানের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে তাঁকে। 

জাকির হোসেন জানান, চিকিৎসা ও যাতায়াত বাবদ তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। আয়ের পথ বন্ধ থাকায় এখন তিনি দেনায় ডুবেছেন। তিনি বলেন, "ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। সামনে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার কথা বলছেন ডাক্তাররা, কিন্তু টাকা পাব কোথায়?"

ভয়াবহ পরিসংখ্যানে মৃত্যুর মিছিল
সরকারি হিসাবমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ৫৯ হাজার শিশু হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। এই অল্প সময়েই ঝরে গেছে ৪২৪টি কচি প্রাণ। হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে ৩৭ হাজারের বেশি শিশুকে। তবে এই সংখ্যার বাইরেও বহু শিশু আক্রান্ত ও চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পকেটের টাকায় চিকিৎসা: 'মরার উপর খাঁড়ার ঘা'
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা বিনামূল্যে হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। ওষুধ, রোগ নির্ণয় পরীক্ষা এবং আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের বড় অংশই কিনতে হচ্ছে বাইরের ফার্মেসি থেকে। বিশেষ করে হামের কারণে নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দিলে প্রয়োজন পড়ছে আইসিইউ বা পিআইসিইউ সেবার। 

ফরিদপুরের ভ্যানচালক আবির শেখ তাঁর ১১ মাস বয়সী সন্তানের জন্য ইতিমধ্যে ৪০ হাজার টাকা খরচ করেছেন, যার পুরোটাই ঋণ করা। যশোর থেকে আসা কেফায়েতুল্লাহর অভিজ্ঞতা আরও করুণ; আইসিইউ শয্যা না পেয়ে ঢাকা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বারান্দায় কাটছে তাঁর শিশুর দিন।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকটে এই ব্যয়ের বোঝা আরও বহুগুণ বেড়েছে। একটি জটিল কেসে পরিবারের খরচ হচ্ছে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত।

কেন এই ভোগান্তি? বিশেষজ্ঞ মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সাইফুন নাহিন শিমুল মনে করেন, দেশের ভঙ্গুর 'রেফারেল সিস্টেম' এই সংকটের জন্য দায়ী। তিনি বলেন, "উপজেলা পর্যায়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে রোগীদের ঢাকা বা বড় শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমত। এছাড়া অভিভাবকের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কার্যকর কোনো স্বাস্থ্য বীমা না থাকায় পরিবারগুলো আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে।"

পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল বিষয়টিকে একটি 'আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং সরকারি সেবার সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলছে।

নেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
হামের এই প্রকোপ মোকাবিলায় কেবল টিকাদান কর্মসূচিই যথেষ্ট নয়, বরং চিকিৎসার অর্থনৈতিক বোঝা কমাতে কার্যকর স্বাস্থ্য সুরক্ষা বীমা বা বিশেষ তহবিলের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তা না হলে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অসংখ্য পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

মূল সারসংক্ষেপ:
পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার অভাবে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে রোগীদের। 
চিকিৎসা ব্যয়ের সিংহভাগ (৬৯%) মেটাতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। 
দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকায় অভিভাবকদের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বাড়ছে ঋণের ভার। 
৫৯ হাজার আক্রান্তের বিপরীতে ৪২৪ শিশুর মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকটকেই প্রকট করে তুলছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow