ভ্যানের হাতল ছেড়ে স্কুলের আঙিনায় জুনায়েদ: মানবিক মানুষের সহযোগিতায় ফিরল শৈশব
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গরুড়া গ্রামের ১০ বছরের শিশু জুনায়েদ। অভাবের নিষ্ঠুর তাড়নায় যে কোমল হাতে উঠেছিল ভ্যানের হাতল, মানবিক মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সেই হাতে এখন শোভা পাচ্ছে নতুন বই ও খাতা। অন্ধকার জীবনের মেঘ কেটে জুনায়েদের মুখে এখন ভুবনভোলানো হাসি; সে ফিরেছে তার চিরচেনা বিদ্যালয়ের আঙিনায়।
গত ৬ মে একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে জুনায়েদের জীবনযুদ্ধের করুণ কাহিনী উঠে আসার পর দেশ-বিদেশের অসংখ্য হৃদয়বান মানুষের সহায়তায় বদলে যায় তার পরিবারের চিত্র।
জুনায়েদের জীবনের গল্পটি ছিল চরম ট্র্যাজেডির। গত ঈদুল ফিতরের দিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যান তার বাবা হাবিবুর রহমান। এর আগেই তার মা জমানো টাকা নিয়ে ঘর ছাড়েন। বৃদ্ধ দাদা-দাদি আর ছোট ভাই-বোনের মুখে আহার তুলে দিতে প্রাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদ বাধ্য হয়ে বাবার ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নামে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ১০ বছরের এই শিশুর জীবনযুদ্ধ নাড়া দিয়েছিল কোটি মানুষের হৃদয়।
সংবাদ প্রকাশের পর দেশ-বিদেশের অসংখ্য সহৃদয় ব্যক্তি ও প্রবাসীরা জুনায়েদের পরিবারের পাশে দাঁড়ান। তাদের পাঠানো আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতায় সচ্ছলতা ফিরতে শুরু করেছে পরিবারটিতে। জুনায়েদের দাদি সপা জান নেছা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "জুনায়েদ যখন ভ্যান নিয়ে বের হতো, বুকটা ফেটে যেত। খবর ছাপা হওয়ার পর অনেক মানুষ সাহায্য করেছেন। এখন আমার নাতি-নাতনিরা আবার স্কুলে যেতে পারছে, আমরা শান্তিতে দু’মুঠো খেতে পারছি।"
জুনায়েদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দিন জানান, জুনায়েদ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। তার অভাবের কথা শুনে শিক্ষকরা ব্যথিত ছিলেন। সে আবারও ক্লাসে ফেরায় বিদ্যালয়ে স্বস্তি ও আনন্দের পরিবেশ বিরাজ করছে।
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্ছ্বসিত জুনায়েদ জানায়, সে কোনোদিন ভাবেনি আবারও স্কুলে ফিরতে পারবে। অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে ভ্যান চালালেও এখন সে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে চায়। তার স্বপ্ন, বড় হয়ে সে "মানুষের মতো মানুষ" হবে এবং আর্তমানবতার সেবায় কাজ করবে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, "উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছি। জুনায়েদ ও তার ভাই-বোনদের পড়াশোনা যেন আর বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও তাদের প্রয়োজনীয় সব সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা হবে।"
একটি সংবাদ এবং একঝাঁক মানবিক মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জুনায়েদ ফিরে পেয়েছে তার হারানো শৈশব। নিভে যাওয়া একটি প্রদীপ আবারও জ্বলে উঠেছে আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনার আলো নিয়ে।
What's Your Reaction?
মোঃ হারুন অর রশীদ, দৌলতপুর প্রতিনিধিঃ