থানচিতে এসএসসির ফলাফলে চরম বিপর্যয়: ৪ স্কুলে পাসের হার ২৫.৬১%, জিপিএ-৫ শূন্য

অনুপম মারমা, থানচি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
১০ আগস্ট, ২০২৬ ৬:৪০ পিএম
শেয়ার করুন:
থানচিতে এসএসসির ফলাফলে চরম বিপর্যয়: ৪ স্কুলে পাসের হার ২৫.৬১%, জিপিএ-৫ শূন্য

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা থানচিতে এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উপজেলার একটি কেন্দ্রের চার বিদ্যালয়ের মোট ২০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে মাত্র ৫২ জন। কোনো শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ পায়নি; সর্বোচ্চ জিপিএ এসেছে ৪.০০। সামগ্রিকভাবে উপজেলায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫ দশমিক ৬১ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম।

বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফলের চিত্র
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থানচি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ফল কিছুটা ভালো হলেও বাকি তিন বিদ্যালয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক। 
থানচি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়: ৬২ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষা দেয় ৬১ জন। পাস করেছে ২৬ জন (পাসের হার ৪২.৬৩%)।
থানচি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়: ৭৫ জনের মধ্যে ৭৪ জন পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৫ জন (পাসের হার ২০.২৭%)।
বলীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়: ৫৭ জনের মধ্যে ৫৫ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র ১০ জন (পাসের হার ১৮.১৮%)।
রেমাক্রী উচ্চ বিদ্যালয়: চরম দুর্গম এলাকার এই বিদ্যালয়টি সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে। ১৪ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জন পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করেছে মাত্র ১ জন। এখানে পাসের হার মাত্র ৭.৬৯ শতাংশ।

অনিয়মিত শিক্ষার্থী ও শ্রেণিকক্ষবিচ্ছিন্নতাকে দায়
বিপর্যয়ের মূল কারণ সম্পর্কে থানচি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূর মোহাম্মদ জানান, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ফরম পূরণের পর পুরো বছর আর বিদ্যালয়ে আসে না। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলেই চূড়ান্ত পরীক্ষায় এই ধস নেমেছে।

পাহাড়ের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত সংকট
দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াতই শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বর্ষাকালে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, অভিভাবকদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার উচ্চ হার। 

স্থানীয় অভিভাবকেরা জানান, পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি সর্বস্তরেই শিক্ষার মান ও পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান তারা।

ঘুরে দাঁড়াতে করণীয়
শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় শুধু তাদের ওপর না চাপিয়ে আসল সংকট খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। থানচি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ক্যহ্লাচিং মারমা বলেন, "থানচির শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘুরে দাঁড় করাতে প্রতিটি বিদ্যালয়ের ফল বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্বল বিষয়ে অতিরিক্ত পাঠদান, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।"

এসএসসির এই হতাশাজনক ফলাফল দুর্গম পাহাড়ের শিক্ষাকাঠামোর দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেই নতুন করে উস্কে দিল। সময়মতো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী দিনগুলোতে পাহাড়ি জনপদের শিক্ষার্থীরা আরও বেশি পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।