কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে জুমের সোনালি ধান কাটার ধুম: ঐতিহ্য ও টিকে থাকার লড়াইয়ে জুমিয়ারা

রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:২৯ পিএম
শেয়ার করুন:
কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে জুমের সোনালি ধান কাটার ধুম: ঐতিহ্য ও টিকে থাকার লড়াইয়ে জুমিয়ারা

আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পার্বত্য জনপদে জুমচাষ আজও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার প্রধান চালিকাশক্তি এবং এক অবিনাশী ঐতিহ্য। রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়গুলোতে এখন চলছে জুমের সোনালি ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মহোৎসব। দিগন্তজোড়া সোনালি ফসলের মাঠে জুমিয়াদের মুখে যেমন ফুটে উঠেছে তৃপ্তির হাসি, তেমনি বহু প্রতিকূলতা আর না-পাওয়ার আক্ষেপও জড়িয়ে আছে এই হাসির আড়ালে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার চিৎমরমের জামাইছড়ি, সীতাপাহাড়, চাকুয়াপাড়া, মৈদং, আড়াছড়ি, কাপ্তাই হরিণছড়া, ব্যাঙছড়ি, ওয়াগ্গা রামপাহাড় এবং মইংপাড়াসহ বিস্তীর্ণ পাহাড়ে এখন জুমের নান্দনিক দৃশ্য। বিশেষ করে চিৎমরমের জামাইছড়ির প্রায় এক হাজার ফুট উঁচুতে মারমা সম্প্রদায়ের জুমিয়ারা বংশপরম্পরায় এই প্রাচীন চাষাবাদ পদ্ধতি টিকিয়ে রেখেছেন।

উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে কাপ্তাইয়ে মোট ৩৩৬ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে জুমচাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে আবাদ হয়েছে পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন জাতের ধান—যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তুর্কি, গ্যালন, দুলি, মাংসাই, বাসমতি, বাঁশ ধান, পাত্তিকী, কবরক এবং লাল ও সাদা বিন্নি ধান। ধানের পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে একই জমিতে ফলানো হয়েছে কলা, হলুদ, আদা, পেঁপে, পাহাড়ি আলু, তিল, তিসি, পাহাড়ি মরিচ, বেগুন, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, শিম ও ভুট্টাসহ হরেক রকমের শাকসবজি।

তবে পাহাড়ের ঢালে এই সোনালি ফসল ফলানোর পথটি একেবারেই সহজ নয়। তীব্র রোদ, বৃষ্টি আর বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পাহাড়ের চূড়ায় মাচাং ঘর তৈরি করে নির্ঘুম রাত পাহারা দিতে হয় জুমিয়াদের। প্রতিবছর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে পাহাড় পরিষ্কার করে শুকিয়ে জুমের জমি তৈরি করা হয়। এরপর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে বৃষ্টির শুরুতে রোপণ করা হয় বিভিন্ন ফসলের বীজ। প্রায় তিন মাস পর ভাদ্র থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ঘরে তোলা হয় সেই ফসল। বর্ষার বৃষ্টির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল এই চাষাবাদে জুমিয়াদের দিতে হয় হাড়ভাঙা শারীরিক শ্রম।

কৃষকদের তথ্যমতে, জুমচাষে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে অনুকূল আবহাওয়া থাকলে প্রায় দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। তবে চলতি মৌসুমে কিছু ক্ষেত্রে ফলন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন চাষিরা। সময়মতো সঠিক পরামর্শ ও কীটনাশক ব্যবহারের অভাবে পোকার আক্রমণে কিছু জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

স্থানীয় জুমিয়া সুইহ্লামং মারমা ও উসুইসিং মারমা আক্ষেপ করে জানান, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সময়মতো সঠিক দিকনির্দেশনা ও সহায়তা পেলে তারা ফসলের ক্ষতি এড়িয়ে আরও বেশি লাভবান হতে পারতেন। অন্যদিকে মৈদং ও ব্যাঙছড়ি পাহাড়ের চাষি সাইংসুই মারমা ও স্বপ্না মারমার মতে, পাহাড়ে পানির তীব্র সংকট চাষাবাদের বড় অন্তরায়। সরকারি উদ্যোগে সেচের টেকসই ব্যবস্থা করা গেলে শাকসবজিসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হতো।

এ বিষয়ে কাপ্তাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (কৃষিবিদ) মো. আহসান হাবীব জানান, জুমচাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী একটি পেশা। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে জুমিয়াদের সাধ্যমতো প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়ে থাকে। জুমচাষের ফলে মাটির কিছু পুষ্টি উপাদান নষ্ট হলেও প্রতিবছর স্থান পরিবর্তন করে চাষ করার কারণে বড় ধরনের ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার একটি বড় অংশ জুমের ওপর নির্ভরশীল। সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি জুমচাষে যদি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সমন্বয় ঘটানো যায় এবং কৃষকদের মাঝে উন্নত জাতের বীজ ও সার সহজলভ্য করা যায়, তবে ফলন দুই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে। এতে জুমিয়ারা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিক লাভবান হবেন এবং তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।

প্রকৃতির সাথে অবিরাম সংগ্রাম করে টিকে থাকা কাপ্তাইয়ের জুমিয়াদের কাছে জুমচাষ কেবল উদরপূর্তির মাধ্যম নয়; এটি তাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, কৃষ্টি আর পাহাড়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক অনন্য গৌরবগাথা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।