চব্বিশের ক্ষত না শুকাতেই ফেনীতে ফের বন্যা আতঙ্ক

অনলাইন ডেস্কঃ
৭ জুলাই, ২০২৬ ১০:৩৬ এএম
শেয়ার করুন:
চব্বিশের ক্ষত না শুকাতেই ফেনীতে ফের বন্যা আতঙ্ক

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের প্রলয়ংকরী বন্যার দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফিরছে ফেনীর মানুষকে। সেই ভয়াবহ দুর্যোগের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি আর অবকাঠামোর ক্ষতি কাটিয়ে যখন সাধারণ মানুষ একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই নতুন করে হানা দিয়েছে বন্যা আতঙ্ক। 

টানা ভারী বর্ষণ আর ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর তীরবর্তী মানুষের মনে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর মুহুরী নদীর ফুঁসে ওঠা পানি দেখে ফেনীর লাখো মানুষের মনে এখন একটাই প্রার্থনা—২০২৪ সালের সেই দুঃস্বপ্নের যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

৫ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত বিশেষ সতর্কতা
গত রোববার (৫ জুলাই) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে দেওয়া এক বিশেষ সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে, ৫ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সতর্কবার্তার পর থেকেই ফেনীবাসীর মনে নতুন করে আতঙ্ক দানা বেঁধেছে।

কাটেনি ২০২৪ সালের ট্রমা
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে ফেনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী বন্যায় জেলার ছয়টি উপজেলায় প্রায় ১৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল। প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত ২৯ জন। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন অবস্থায় লাখ লাখ মানুষের সেই জীবনযুদ্ধের ট্রমা এখনো স্থানীয়দের মন থেকে মুছে যায়নি। বিশেষ করে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার মানুষ নদীর সামান্য পানি বাড়লেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।

পরশুরামের সাতকুচিয়া এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান নিজের ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “গতবারের বন্যায় ঘরবাড়ি সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। অনেক ধার-দেনা করে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু কোনোমতে ঠিক করেছি। দুই দিন ধরে যেভাবে মেঘ ডাকছে আর বৃষ্টি হচ্ছে—বুকটা কাঁপছে। আবার যদি পানি ঢোকে, তবে আমাদের আর বেঁচে থাকার কোনো পথ থাকবে না।”

অনুরূপ আশঙ্কা প্রকাশ করে ফুলগাজী উপজেলার বাসিন্দা ও সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম মজুমদার বলেন, “আমি বিগত বন্যায় সর্বস্ব হারিয়েছি। এখন যদি আবার বন্যা হয়, তবে আমাদের একেবারে শেষ হয়ে যেতে হবে।”

জোড়াতালি দেওয়া বাঁধ নিয়ে সংশয়
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিগত বন্যায় মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীরক্ষা বাঁধের যেসব জায়গায় ভাঙন ধরেছিল, তার অনেকগুলোই এখনো স্থায়ী ও টেকসইভাবে সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। সাময়িকভাবে জোড়াতালি দেওয়া বাঁধগুলো এবারের পাহাড়ি ঢলের চাপ কতটা সইতে পারবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। বাঁধ ভেঙে আবারও লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কায় নদীপাড়ের মানুষ এখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

ফেনীবাসীর দাবি, প্রতি বছর বর্ষা এলেই ভারতের উজান থেকে আসা পানির ঢলে তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য নদীগুলোর নিয়মিত ড্রেজিং (খনন) এবং সীমান্ত সংলগ্ন নদীগুলোতে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা জরুরি।

প্রশাসন ও আবহাওয়া অফিসের বক্তব্য
নতুন করে বন্যার আশঙ্কার মুখে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার মজুত করা এবং জরুরি উদ্ধারকাজের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান জানান, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় ফেনীতে ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে অতিবৃষ্টিপাত বা পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করলে নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, “ফেনীসহ পাঁচ জেলায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের একটি পূর্বাভাস রয়েছে। জেলায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যদি অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল নামে তবে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে আমরা সতর্ক রয়েছি এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।