কাপ্তাইয়ে সরকারি লিজের জমি জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের মামলা: ১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তোলপাড়

রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ
৬ জুলাই, ২০২৬ ১১:৩০ পিএম
শেয়ার করুন:
কাপ্তাইয়ে সরকারি লিজের জমি জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের মামলা: ১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তোলপাড়

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার শিলছড়ি এলাকায় সরকারি লিজকৃত জমির মালিকানা জালিয়াতির মাধ্যমে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মামলায় অভিযুক্ত স্টারলিং প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাহমুদ খানের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী।

দুদকের রাঙ্গামাটি সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রাজু আহমেদের দায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, শিলছড়ি গ্রামে অবস্থিত স্টারলিং প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে সরকারি জমি লিজ নেওয়ার কোনো বৈধ রেকর্ডপত্র পাওয়া যায়নি। তবে প্রকৃত তথ্য গোপন করে এবং জাল নথিপত্রের মাধ্যমে হাসান মাহমুদ খান নিজেকে জমির বৈধ মালিক হিসেবে দাবি করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার তথ্যমতে, ২০১৫ সালে আনসার ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প স্থাপনের জন্য ওই এলাকার ২২ দশমিক ১৭ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে জেলা প্রশাসন ৮ দশমিক ০৯ একর জমির জন্য ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে। অভিযোগ রয়েছে, সেই সুযোগে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ২০১৮ সালের ২ জুলাই হাসান মাহমুদ খান সরকারি কোষাগার থেকে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা উত্তোলন করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৫৫-৫৬ সালের দিকে স্টারলিং প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কারখানার মালিকরা দেশত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে মরহুমা আছিয়া খানম নিজেকে কারখানার মালিক দাবি করে জমি শেল অয়েল কোম্পানির কাছে সাব-লিজ দেন। পরে ওই জমিতে আনসার ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯১ সালে আছিয়া খানমের মৃত্যুর পর তার ছেলে হাসান মাহমুদ খান কারখানার যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও অন্যান্য মালামাল বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যত বিলুপ্ত করে দেন। এরপরও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচয় দিয়ে সরকারি ক্ষতিপূরণের অর্থ গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মিনু মারমা ও বিএনপি নেতা জাফর আহমদ স্বপন জানান, শিলছড়ি এলাকায় প্রায় ১১৪টি ভূমিহীন পরিবার ৪০ থেকে ৬০ বছর ধরে বসবাস করছে। সেখানে তাদের বসতভিটা, মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান ও খেলার মাঠসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা গড়ে উঠেছে। তাদের অভিযোগ, ভুয়া মালিকানা দাবি করে হাসান মাহমুদ খান এসব পরিবারকে উচ্ছেদের আতঙ্কে রেখেছেন।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের বসতভিটার বৈধ বন্দোবস্তের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আদালতে দায়ের করা সিভিল স্যুট (নং-৮৮/১৯) বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি আদালত হাসান মাহমুদ খানের মামলা খারিজের আবেদন নামঞ্জুর করেন। পরে তিনি সিভিল আপিল (নং-২০/২০২৫) দায়ের করেন, যা এখনও বিচারাধীন।

ভুক্তভোগীদের আইনজীবীদের দাবি, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুসন্ধান চালিয়েও স্টারলিং প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মালিকানার পক্ষে কোনো বৈধ দাখিলিক নথি পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসীর ভাষ্য, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বা অস্তিত্বই নেই, সেখানে মালিক পরিচয়ে সরকারি অর্থ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত হাসান মাহমুদ খানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে এবং সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুদকের দায়ের করা মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ২০১, ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে কোনো ধরনের সরকারি অর্থ প্রদান না করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন শিলছড়িবাসী।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।