ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন ৪০ বছরের জননী
শিক্ষার কোনো বয়স নেই—এই চিরন্তন সত্যকে আবারও নতুন করে প্রমাণ করলেন নাটোরের লালপুরের ফুলঝড়ি বেগম। জীবনের নানা প্রতিকূলতা এবং দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে ৪০ বছর বয়সে বড় ছেলের সঙ্গে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় বসেছেন এই অকুতোভয় নারী। অদম্য এই ইচ্ছাশক্তি এলাকায় যেমন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে, তেমনি প্রশংসা কুড়াচ্ছে সর্বমহলে।
মা ও ছেলের শিক্ষাজীবন
ফুলঝড়ি বেগম ও তার ১৫ বছর বয়সী ছেলে মনিরুল ইসলাম নাটোরের লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তারা দুজনেই মোহরকয়া নতুনপাড়া মাধ্যমিক কারিগরি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তারা উপজেলার মধুবাড়ি দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন।
সংসার ও সংগ্রামের গল্প
ফুলঝড়ি বেগমের জীবন মোটেও সহজ ছিল না। স্বামী নজরুল ইসলাম পেশায় একজন ভ্যানচালক এবং দিনমজুর। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে নিজের পড়াশোনার স্বপ্নকে বহু আগেই বিসর্জন দিতে হয়েছিল তাকে। তাদের বড় মেয়ে এরই মধ্যে নার্সিং শেষ করে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন। কিন্তু মনের কোণে জমানো পড়াশোনার সেই সুপ্ত বাসনা ফুলঝড়ি বেগমকে তাড়া করে ফিরত সবসময়।
স্বপ্ন পূরণের আনন্দ
ফুলঝড়ি বেগম জানান, "ছোটবেলায় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হওয়ায় পড়াশোনা আর এগোয়নি। সংসার আর সন্তানদের বড় করতেই জীবন কেটে গেছে। তবে পরীক্ষার হলে বসার স্বপ্নটা সারাজীবন ছিল। আজ ছেলে আর পরিবারের সমর্থনে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। গ্রামের অনেকে কটু কথা বললেও আমি পিছু হটিনি। মা-ছেলে একসঙ্গে পরীক্ষা দিচ্ছি, এটা আমার জন্য পরম আনন্দের।"
ছেলের চোখে মা এখন অনুপ্রেরণা। মনিরুল ইসলাম বলে, "মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দিতে পেরে আমি খুব গর্বিত। মা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। এই বয়সে তাকে পড়াশোনা করতে দেখে আমি পড়াশোনায় আরও বেশি উৎসাহ পাচ্ছি।"
পরিবারের সমর্থন
স্ত্রী ও সন্তানের এই পথচলায় গর্বিত স্বামী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষিত মা-ই পারে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে। ভ্যান চালিয়ে কষ্ট করে হলেও আমি তাদের পড়াশোনা চালিয়ে নেব। আমার স্ত্রী যতদূর পড়তে চায়, আমি তার পাশে থাকব।"
প্রশাসনের প্রশংসা ও সহযোগিতা
এই ঘটনাকে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জুলহাস হোসেন সৌরভ। তিনি বলেন, "ফুলঝড়ি বেগম প্রমাণ করেছেন বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না। তার এই পদক্ষেপ সমাজের অন্য নারীদের এবং বয়স্ক শিক্ষাকে উৎসাহিত করবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পড়াশোনার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।"
নাটোরের ফুলঝড়ি বেগম আজ শুধু একজন পরীক্ষার্থী নন, বরং তিনি অদম্য সাহসের এক জীবন্ত প্রতীক।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ