পশ্চিমবঙ্গে চার দিনে সহিংসতার ঘটনা ৩৪টি, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিমরা
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরবর্তী চার দিনে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে। নাগরিক অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটস’ (এপিসিআর)-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ৪ মে থেকে ৭ মে পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে অন্তত ৩৪টি বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় মূলত লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়, তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক এবং গবাদি পশুর হাটগুলোকে।
পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল আসার পর থেকেই বিজেপির জয়ের সমান্তরালে সহিংসতার হার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। হামলার ধরন বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, এর পেছনে বিজেপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। তবে রাজ্যে গণমাধ্যমের সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে সংস্থাটিকে মূলত স্থানীয় সূত্রের তথ্যের ওপর নির্ভর করে এই প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি
সহিংসতার ভয়াবহতায় অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে, যাঁদের মধ্যে একজন হিন্দু ও একজন মুসলিম। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অন্তত ৫০ জন মুসলিম শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন এবং ৫৪টি স্থাবর সম্পত্তিতে হামলা চালানো হয়েছে। সহিংসতার ধরণ অনুযায়ী:
* ১৯টি ক্ষেত্রে সম্পত্তির ওপর হামলা হয়েছে।
* ১৪টি ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে।
* ১০টি ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বয়কট করা হয়েছে।
* ৫টি আমিষ খাবারের দোকান ও পরিবহনে হামলা চালানো হয়েছে।
* ৩টি স্থানে বুলডোজার ব্যবহারের ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে।
ভৌগোলিক বিস্তার
ঝাড়খণ্ড সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলো বাদে গোটা পশ্চিমবঙ্গেই এই সহিংসতার প্রভাব ছিল। এর মধ্যে কোচবিহার ও উত্তর ২৪ পরগনায় সর্বোচ্চ ৭টি করে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কলকাতা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ ও মালদাতেও একাধিক হামলার খবর পাওয়া গেছে। সংস্থাটির মতে, এই ভৌগোলিক বিস্তার প্রমাণ করে যে এসব ঘটনা কেবল স্থানীয় গোলযোগ নয়, বরং একটি সুসংগঠিত বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।
লক্ষ্যবস্তু যখন বাড়িঘর ও উপাসনালয়
আক্রান্ত ৫৪টি সম্পত্তির মধ্যে মুসলিমদের ১৭টি বাড়ি, ১০টি মসজিদ এবং ৮টি দোকান ও হোটেল রয়েছে। এছাড়া তৃণমূল কংগ্রেসের ৮টি কার্যালয় ও সমর্থকদের বাড়িতেও হামলা চালানো হয়। এমনকি মুসলিমদের নামে নামাঙ্কিত রাস্তা ও গবাদি পশুর হাটও বাদ পড়েনি দুষ্কৃতকারীদের হাত থেকে।
তৃণমূলের তীব্র প্রতিক্রিয়া
এই অরাজক পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশের উপস্থিতিতেই বিজেপি-সংশ্লিষ্টরা দোকানে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের রুটি-রুজি আজ রাজনৈতিক হাতিয়ারের শিকার। অমিত শাহ ও বিজেপির রাজনীতির আসল রূপ হলো বিভাজন ও ভীতি প্রদর্শন।’ কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, ‘যখন পশ্চিমবঙ্গ পুড়ছে, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন? আইনশৃঙ্খলার এই অবনতি অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে।’
এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সামাজিক কাঠামো ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর আসা হুমকির একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ