সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা ফি আদায়ের মহোৎসব

নুরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টারঃ
May 11, 2026 - 17:45
সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা ফি আদায়ের মহোৎসব

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় সরকারি নির্দেশনা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল—প্রশ্নপত্র বা উত্তরপত্রসহ পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো খাতেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এক টাকাও নেওয়া যাবে না। কিন্তু সেই আদেশ অমান্য করে প্রকাশ্যে ফি আদায় করায় অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের ৫৯ নম্বর ইকড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২১ নম্বর কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম সাময়িক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০ টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। 

ইকড়াইল ও কৃষ্ণপুর এলাকাটি মূলত নদীভাঙনকবলিত এবং এখানকার অধিকাংশ মানুষই নিম্নআয়ের। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যেখানে সন্তানদের তিন বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে সরকারি স্কুলে 'অবৈধ' ফি আদায়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দরিদ্র অভিভাবকরা।

সরেজমিনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইকড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ মহিবুল্লাহ ইসলাম ও মুস্তাক হোসেন মিরাজের কাছ থেকে ৪০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল জানায়, নিচু ক্লাসের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০ টাকা এবং চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক আশরাফ হোসেনের নির্দেশে সহকারী শিক্ষিকা ফুলমালা খাতুন এই টাকা সংগ্রহ করেন বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।

একই চিত্র দেখা গেছে ২১ নম্বর কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতি ও মরিয়ম জানায়, তাদের কাছ থেকে ৬০ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগ জানাজানি হওয়ার পর গত ৯ মে পরীক্ষার শেষে কিছু শিক্ষার্থীর টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। খুচরা টাকার সংকট দেখিয়ে বাকিদের টাকা পরে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষকরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, "সরকার বলে লেখাপড়া ফ্রি, অথচ স্কুলে গেলেই নানা উছিলায় টাকা চায়। আমরা গরিব মানুষ, টাকা না দিলে বাচ্চাদের সঙ্গে শিক্ষকরা খারাপ ব্যবহার করবেন—এই ভয়ে বাধ্য হয়েই টাকা দিয়েছি।"

এ বিষয়ে ২১ নম্বর কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামাল আহমেদ বলেন, "স্লিপের টাকা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে খরচ চালাতে টাকা নেওয়া হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে না নিলে কি নিজের পকেট থেকে দেব?" 

অন্যদিকে, ৫৯ নম্বর ইকড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশরাফ হোসেন টাকা নেওয়ার কথা প্রথমে স্বীকার করতে চাইলেও পরে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

আলফাডাঙ্গা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সরোয়ার হোসেন এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়ে বলেন, "অধিদপ্তর থেকে পরীক্ষার ফি নেওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। স্লিপের বরাদ্দকৃত টাকা থেকেই পরীক্ষার খরচ মেটানোর নির্দেশনা রয়েছে। ইতিমধ্যে স্লিপের ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ এসেছে, যা পর্যায়ক্রমে আরও বাড়বে।" তিনি আরও যোগ করেন, "শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তদন্ত করা হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে এভাবে অর্থ আদায় শুধু অনিয়ম নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি চরম দায়িত্বহীনতা। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ ফেরত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow