রাণীনগরে আশ্রয়ণের ঘর কেনাবেচার ধুম: গৃহহীনদের ঘর এখন প্রভাবশালীদের দখলে

আব্দুল মজিদ মল্লিক, জেলা প্রতিনিধি, নওগাঁঃ
May 12, 2026 - 18:44
May 12, 2026 - 18:44
রাণীনগরে আশ্রয়ণের ঘর কেনাবেচার ধুম: গৃহহীনদের ঘর এখন প্রভাবশালীদের দখলে

নওগাঁর রাণীনগরে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নিয়ে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম ও কেনাবেচার মহোৎসব। ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য নির্মিত এসব ঘর এখন স্রেফ ব্যবসার পণ্যে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত অভাবীদের বাদ দিয়ে বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা এখন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বারবার হাতবদল হচ্ছে। এমনকি সরকারি ঘর দখল করে কেউ কেউ সেগুলোকে বিলাসবহুল বাসস্থানে রূপান্তর করেছেন।

উপজেলার মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় অনিয়মের নানা খণ্ডচিত্র। প্রকল্পের ৫ নম্বর ঘরটি বরাদ্দ পেয়েছিলেন মল্লিকা নামের এক নারী। কিন্তু সেখানে এখন বাস করছেন প্রবাসী সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা বিবি। ঘরের ভেতরে পা রাখলে বোঝার উপায় নেই এটি কোনো সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি। মেঝেজুড়ে দামী কার্পেট, আধুনিক ফ্রিজ আর দেয়ালে ঝুলছে ৪৩ ইঞ্চি স্মার্ট টেলিভিশন। মর্জিনা বিবি জানান, তিনি মকবুল নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বাড়িটি কিনেছেন। মকবুল আবার এটি কিনেছিলেন মূল বরাদ্দপ্রাপক মল্লিকার কাছ থেকে। মর্জিনা কেবল ৫ নম্বরই নয়, ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় ৬ নম্বর ঘরটিও কিনে নিয়েছেন। কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও স্ট্যাম্পে সই ও দলিলের মাধ্যমে এসব ঘর কেনাবেচা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রকল্পের একের পর এক ঘর বিক্রি হয়েছে। ৭ নম্বর ঘরটি ৭০ হাজার টাকায় কিনেছেন আমিন, ৯ নম্বর ঘর ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় কিনেছেন আসাদুল এবং ১০ নম্বর ঘর ৮০ হাজার টাকায় কিনেছেন সফেটা নামের এক নারী। একইভাবে ১৪, ১৮, ১৯ ও ২২ নম্বর ঘরগুলো ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে হাতবদল হয়েছে।

এই অবৈধ কেনাবেচায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পের বাসিন্দা হাফিজুলের স্ত্রী নাজমা বেগমের বিরুদ্ধে। বিষয়টি স্বীকার করে নাজমা বেগম বলেন, “যাদের ঘর দেওয়া হয়েছে, তারা মূলত অন্য এলাকার এবং এখানে থাকতে চায় না। তাই আমি স্থানীয়দের কাছে ঘরগুলো বিক্রিতে সহায়তা করেছি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত ভূমিহীনদের বঞ্চিত করে অনিয়মের মাধ্যমে বিত্তবানদের ঘর বরাদ্দ দেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, নারায়নপাড়ার বাসিন্দা সাইদ ও তার ছেলে প্রবাসে থেকে প্রচুর আয় করলেও প্রভাব খাটিয়ে ঘর বাগিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া গ্রাম পুলিশ ছাবিনা ইয়াসমিন মীম ও তার বোন বানিছাও ঘর পেয়েছেন। মীম নিজের ঘরটি প্রাচীর দিয়ে ঘিরে সাজিয়েছেন এবং সেটি ৩ লাখ টাকায় বিক্রির জন্য দরদাম করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে মীম ঘর বিক্রির চেষ্টার কথা অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি রাগের মাথায় দাম চেয়েছিলেন।

প্রকল্পের সভাপতি ফরিদ আলী ঘরের কেনাবেচার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “৩২টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১০-১২টি ঘর অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়েছে। আমি বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) লিখিতভাবে জানিয়েছি।”

এ বিষয়ে রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাকিবুল হাসান বলেন, “ঘর কেনাবেচার বিষয়টি জানার পর আমরা তদন্ত শুরু করেছি। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে এবং সরকারি ঘরের অবমাননা বা কেনাবেচায় যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow