উদ্বোধনের আগেই ফাটল: কোটালীপাড়ায় পৌনে ১৩ কোটির মডেল মসজিদে অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ

অনলাইন ডেস্কঃ
৩০ জুন, ২০২৬ ১১:৪০ এএম
শেয়ার করুন:
উদ্বোধনের আগেই ফাটল: কোটালীপাড়ায় পৌনে ১৩ কোটির মডেল মসজিদে অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ

ধর্মীয় শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক সম্প্রীতির আধুনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় নির্মাণ করা হচ্ছে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। তবে উদ্বোধনের আগেই প্রায় ১২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে স্থানীয়দের মাঝে কাজের গুণগত মান নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নবনির্মিত এই ভবনের দেয়াল ও প্লাস্টারের বেশ কিছু স্থানে ছোট-বড় ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ফাটলগুলো ঢাকতে কোথাও কোথাও প্লাস্টার কেটে নতুন করে প্রলেপ দেওয়ার কাজ চলছে। এছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় কাজের বিবরণ সংবলিত কোনো তথ্য বোর্ড বা সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ, মোট ব্যয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার বিস্তারিত তথ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

দেড় বছরের প্রকল্প গড়িয়েছে সাত বছরে
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশব্যাপী ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১৯ সালে কোটালীপাড়া মডেল মসজিদের কাজ শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৮ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও দীর্ঘ সাত বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রথম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জমি সংক্রান্ত জটিলতা ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে মাঝপথে কাজ ফেলে চলে যায়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘এমডি বদরুল ইকবাল লিমিটেড’ নামের নতুন একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তারা কাজ বুঝিয়ে দিতে পারেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও তদারকির অভাবেই আজ এই দশা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহ জানান, ভবনের মূল কাঠামো বা কলাম ও বিমে কোনো ত্রুটি নেই। প্লাস্টারের ফাটলগুলো মেরামতের কাজ চলছে। কাজের ধীরগতির কারণ হিসেবে তিনি প্রায় তিন কোটি টাকার বিল বকেয়া থাকা এবং শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি দিতে না পারার বিষয়টি উল্লেখ করেন। বকেয়া বিল পেলে আগামী দুই মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি দাবি করেন।

কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাগুফতা হক ফাটলের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমি এখানে যোগদানের পর থেকেই মসজিদটি একই অবস্থায় দেখছি। পূর্ববর্তী জেলা প্রশাসকও ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ দিয়েছিলেন।"

গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম খান জানান, জুন মাসের দাপ্তরিক ব্যস্ততার কারণে তিনি নিজে এখনও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারেননি। তবে ঠিকাদারের প্রকৌশলীকে ফাটলগুলো দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ব্যস্ততা কমলে তিনি নিজে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদারকি করবেন।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও তদন্তের দাবি
দীর্ঘদিন ধরে কাজ শেষ না হওয়ায় নারী-পুরুষের পৃথক নামাজ, লাইব্রেরি, হজের প্রশিক্ষণ এবং ধর্মীয় গবেষণার মতো সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় কোটালীপাড়া কল্যাণ সংঘের সভাপতি সোহেল শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "দীর্ঘ সাত বছরের বিলম্ব, বারবার ঠিকাদার পরিবর্তন, কাজের নিম্নমান এবং তদারকির অভাব—সব মিলিয়ে এই প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। শুধু ফাটল ঢেকে কাজ শেষ করলে হবে না; একটি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে ভবনের প্রকৃত কারিগরি মান পরীক্ষা করতে হবে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।