ভারতে মুসলিম নারীদের টার্গেট করে অশ্লীল ছবি তৈরির হিড়িক

অনলাইন ডেস্কঃ
১৫ জুন, ২০২৬ ৬:০১ পিএম
শেয়ার করুন:
ভারতে মুসলিম নারীদের টার্গেট করে অশ্লীল ছবি তৈরির হিড়িক

ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মুসলিম নারীদের নিশানা বানিয়ে যৌন উত্তেজক ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই নেতিবাচক অপপ্রয়োগ সাধারণ নারীদের জীবনকে চরম মানসিক ট্রমা ও সামাজিক অপদস্ততার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।

সামরিনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা
ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ২৪ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স মডেল সামরিন আইয়ুব। গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রোল করার সময় একটি ভিডিও দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান তিনি। নয়াদিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ের তাঁর সাধারণ কিছু ছবি (গ্রুপ প্রজেক্ট, বিদায় অনুষ্ঠান ও সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা সেলফি) ব্যবহার করে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে একটি ভুয়া ভিডিও তৈরি করা হয়েছিল।

ভিডিওটির ব্যাকগ্রাউন্ডে এআই-নির্মিত ভয়েসওভার ও আকর্ষণীয় শিরোনাম ব্যবহার করে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উপায়ে মিথ্যা দাবি করা হয়—তিনি একজন মুসলিম নারী হয়ে হিন্দু পুরুষদের কাছে ‘নিজের শরীর বিক্রি করছেন’। এমনকি ছবিতে থাকা তাঁর আপন ভাইকে তাঁর ‘দালাল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। 

সামরিন বলেন, *"ভিডিওটি এতটাই নিখুঁত ও বাস্তব মনে হচ্ছিল যে, আমার বাবা-মাও যদি এটি দেখতেন, তাহলে সত্যি বলে বিশ্বাস করে বসতেন।"* এই ঘটনার পর সামরিনকে তীব্র সাইবার হ্যারাসমেন্ট বা অনলাইনের মাধ্যমে হেনস্তার শিকার হতে হয়।

গবেষণায় উঠে আসা আশঙ্কাজনক তথ্য
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ (CSOH) ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত এক্স (সাবেক টুইটার), ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ২৯৭টি পাবলিক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রহ করা ১ হাজার ৩২৬টি এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, মুসলিম নারীদের যৌনতাপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা কনটেন্টগুলোই সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসব কনটেন্টে ৬৭ লাখেরও বেশি প্রতিক্রিয়া (লাইক, কমেন্ট, শেয়ার) এসেছে। 

গবেষণার সহ-লেখক ও ডিজিটাল বিশ্লেষক জেনিথ খান জানান, ‘জেনারেটিভ এআই’ প্রযুক্তির কারণে এখন অত্যন্ত সহজে ও প্রায় বিনা খরচে মানুষের বিকৃত যৌন কল্পনাকে বাস্তবসম্মত ছবিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ছবি ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সামান্য কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিও যেকোনো বিদ্বেষপূর্ণ বিষয়কে বাস্তবসম্মত উপায়ে ছড়িয়ে দিতে পারছে।

সাম্প্রদায়িক আধিপত্য ও ‘রাজনৈতিক অশ্লীলতা’
গবেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বহু সংস্কৃতিতে নারীকে পরিবারের সম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই মুসলিম নারীদের এভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো আদতে পুরো সম্প্রদায়কে হেয় প্রতিপন্ন করার একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক কৌশল।

মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম নৃবিজ্ঞানী সাহানা উদুপা এই ঘটনাকে সংখ্যালঘু ও নারীদের বিরুদ্ধে চালানো এক ধরনের ‘রাজনৈতিক অশ্লীলতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো মিম, কৌতুক এবং যৌনতাপূর্ণ ছবির আড়ালে নারীদের ওপর ডিজিটাল নির্যাতনকে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করছে।

গবেষক সোমা বসুর মতে, ভারতে মুসলিম নারীদের শরীর যেন এক সাম্প্রদায়িক আধিপত্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইতিপূর্বেও ‘সুলি ডিলস’ এবং ‘বুলি বাই’ নামক প্ল্যাটফর্মে মুসলিম নারীদের ছবি আপলোড করে তাদের ‘অনলাইন নিলাম’-এর মতো ঘৃণ্য ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। 

২০১৯ সালের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে কথা বলে ক্রমাগত অনলাইন হুমকির শিকার হওয়া অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা বলেন, *"এসব ছবি ও ভিডিও প্রতিনিয়ত আমাদের মনে এক গভীর ভয়ের মনস্তত্ত্ব তৈরি করে। আমরা নিজেদের কোনোভাবেই নিরাপদ মনে করতে পারিAddress না।"

আইনের সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা
সামরিন আইয়ুব এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নয়াদিল্লির সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের সহায়তায় একযোগে রিপোর্ট করার পর প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে ভিডিওটি সরানো সম্ভব হয়। তবে ততক্ষণে তাঁর ক্যারিয়ার ও সুনামের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যায়।

ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও আইনজীবী অপার गुप्तা জানান, ভারতের বর্তমান আইনি কাঠামো দ্রুত পরিবর্তনশীল এআই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ছবিটি যদি সম্পূর্ণ এআই বা কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়ে থাকে, তবে প্রচলিত আইনের অনেক ধারাই সেখানে সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না।

উপসংহার
আইনি জটিলতা, সামাজিক লজ্জা ও মানসিক আঘাতের কারণে আক্রান্ত অধিকাংশ নারীই এসব বিষয়ে মুখ খোলেন না। ফলে অপরাধীরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অ্যালগরিদম ও আইনি কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন না আনলে এআই-নির্ভর এই সাইবার সহিংসতা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।