সীতাকুণ্ডে শিশু ইরা মনি হত্যা মামলায় বাবু শেখের মৃত্যুদণ্ড

অনলাইন ডেস্কঃ
৯ জুলাই, ২০২৬ ৪:১৫ পিএম
শেয়ার করুন:
সীতাকুণ্ডে শিশু ইরা মনি হত্যা মামলায় বাবু শেখের মৃত্যুদণ্ড

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আট বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল নেসা ওরফে ইরা মনিকে শ্বাসনালি কেটে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে একমাত্র আসামি বাবু শেখকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই ২০২৬) দুপুরে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস এই রায় ঘোষণা করেন। 

মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের মাত্র চার মাসের মাথায় এবং অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে এই রায় ঘোষণা করা হলো, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম রায়।

**আদালতের দণ্ডের বিবরণ**
আদালতের রায়ে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অপরাধে ঘাতক বাবু শেখকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ধর্ষণচেষ্টার অপরাধে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অপর একটি ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের রায় দিয়েছেন আদালত।

রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এপিপি অ্যাডভোকেট সারোয়ার লাভলু সাংবাদিকদের বলেন, "রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ে সন্তুষ্ট। এটি একটি অত্যন্ত নৃশংস ও হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড ছিল। আমরা চাই উচ্চ আদালতের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই রায় কার্যকর করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।"

**হত্যাকাণ্ডের বিবরণ**
নিহত ইরা মনি সীতাকুণ্ড উপজেলার ছোট কুমিরা মাস্টারপাড়া এলাকার টমটম চালক মনিরুল ইসলামের মেয়ে এবং স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সাজাপ্রাপ্ত আসামি বাবু শেখ তাদের প্রতিবেশী ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মধ্যম পুলুপাড়ায়।

মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১ মার্চ সকালে চকলেট কিনে দেওয়া ও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ইরা মনিকে ফুসলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যান বাবু শেখ। এরপর বাসে করে তাকে সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেনসংলগ্ন একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন বাবু শেখ। ইরা মনি চিৎকার শুরু করলে এবং বিষয়টি সবাইকে বলে দেওয়ার কথা জানালে ক্ষিপ্ত হয়ে বাবু শেখ ধারালো চাকু দিয়ে তার শ্বাসনালি কেটে ফেলে রেখে পালিয়ে যান।

সেদিন দুপুরে ওই পাহাড়ে সড়ক সংস্কারের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা রক্তাক্ত ও গলাকাটা অবস্থায় শিশুটিকে জঙ্গল থেকে হেঁটে আসতে দেখেন। শ্রমিকরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩ মার্চ ভোরে শিশুটি মারা যায়।

**দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন**
ইরা মনির মৃত্যুর পর তার মা বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পর ৩ মার্চই কুমিরা এলাকা থেকে বাবু শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেন যে, ইরা মনির বাবার সঙ্গে পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবেই তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। ৪ মার্চ আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তদন্ত শেষে পুলিশ গত ১১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর ১৮ জুন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মাত্র ছয় কার্যদিবসে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ৩০ জুন আসামির সাফাই সাক্ষ্য নেওয়ার পর আদালত রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। এর আগে গত ৭ জুলাই রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকলেও রায় পুরোপুরি লিখে শেষ করতে না পারায় আদালত আজ বৃহস্পতিবার নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।