রংপুরে চার খুনের ঘটনায় পুলিশের ‘ইউটার্ন’

অনলাইন ডেস্কঃ
২৭ আগস্ট, ২০২৬ ২:১৬ পিএম
শেয়ার করুন:
রংপুরে চার খুনের ঘটনায় পুলিশের ‘ইউটার্ন’

রংপুর মহানগরীতে সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনার সময় ও বিবরণ নিয়ে ‘ইউটার্ন’ নিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সময় নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নতুন করে দাবি করা হচ্ছে—ঘটনাটি ঘটেছে সকালবেলা। অথচ এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছিল, হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল দিবাগত রাতে। একই ঘটনার বর্ণনায় পুলিশের এমন পরস্পরবিরোধী তথ্যে হত্যাকাণ্ডের সামগ্রিক তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর মহানগর পুলিশ (আরপিএমপি) কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ মামলার তদন্তের নতুন অগ্রগতি তুলে ধরেন। এর আগে গত শনিবার (২৩ আগস্ট) রাতে নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ার নিজ বাসা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রাপ্তি এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ও তদন্তের গতিপথ
হত্যাকাণ্ডের পর দিনই পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সম্পর্কে খালাতো-মামাতো ভাই সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে। পরে অধিকতর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের স্বার্থে মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া এই মামলার সাক্ষী হিসেবে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের বন্ধু সীমান্ত দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

আগের দাবি বনাম বর্তমান বক্তব্য
শুরুতে পুলিশের ভাষ্য ছিল—বৃহস্পতিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে অভিযুক্তরা মাদক (ইয়াবা) সেবন করছিল। ছাদে শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে গলায় গামছাসহ ওপরে উঠলে তাঁকে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে শব্দ পেয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে একে একে তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করা হয়। সবশেষে পরিচয় গোপন রাখতে ঘরে থাকা শিশু আয়ুশকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

তবে বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিবরণ দেয়। পুলিশ কমিশনার জানান:
অতিরিক্ত মাদক গ্রহণ: ঘটনার দিন আসামিরা ৯টি ইয়াবা সেবন করেছিল। ভোররাত পর্যন্ত সীমান্তের বাড়িতে সেবনের পর তারা পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে এসে পানির ট্যাংকের আড়ালে বাকি মাদক সেবন করে।
সকালে হত্যাকাণ্ড: ইয়াবা সেবনের মধ্যেই সকালের আলো ফুটে যায়। গণপতি চক্রবর্তী সকালে ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ধমক দেন। তখন মান-সম্মানের ভয়ে আসামিরা গণপতির গামছা দিয়েই তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করে।
মা ও মেয়েকে হত্যা: গণপতিকে হত্যার পর পালানোর সময় তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে চিৎকার করলে তাঁদেরও গামছা ও কবুতরের খাঁচার পাশের রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার ভয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের তার কেটে দিয়ে মরদেহ দুটি সিঁড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়।
শিশু আয়ুশ হত্যা ও ডাকাতির নাটক: তিনজনকে হত্যার পর ঘরে ঢুকলে আয়ুশ জেগে উঠে সিদ্ধার্থকে ‘দাদা’ বলে ডেকে ওঠে। তখন শিশুটিকেও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর বিষয়টি ‘ডাকাতি’ সাজাতে আসামিরা ড্রয়ার তছনছ করে ১৫ হাজার টাকা ও কিছু স্বর্ণালংকার লুট করে। পরে বাথরুমে গোসল ও আরও একটি ইয়াবা সেবন শেষে জুমার নামাজের সময় তারা দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকার সিদ্ধার্থ এক পরিচিত নারীর বাড়ির পেছনে মাটিচাপা দিয়ে লুকিয়ে রেখেছিল এবং টাকার একাংশ দিয়ে নিজের বন্ধক রাখা মোবাইল উদ্ধার করেছিল।

তদন্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষ
পুলিশের নতুন বক্তব্য নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও আইনজীবীরা। 

রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ বলেন, “আসামিরা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর কারাগারে রয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে আসামিদের নতুন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তাহলে পুলিশ এই সম্পূর্ণ নতুন তথ্যগুলো কোথা থেকে পেল?”

তিনি আরও যোগ করেন, শুরু থেকেই পুলিশের বিভিন্ন বক্তব্য ও কার্যক্রমে যেসব অসংগতি দেখা দিয়েছিল, নতুন এই বক্তব্যের ফলে সেই সন্দেহ ও বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।