'আমি আমার জীবনসঙ্গীর হাত ধরে রেখেছিলাম, কিন্তু স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল’

অনলাইন ডেস্কঃ
২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫৫ এএম
শেয়ার করুন:
'আমি আমার জীবনসঙ্গীর হাত ধরে রেখেছিলাম, কিন্তু স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল’

‘চারপাশ থেকে কাদা আর পানির বিশাল স্রোত ধেয়ে আসছিল। আমি কোনোমতে আমার স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরে ছাদে ওঠার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু স্রোতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে চোখের সামনেই কাদার তোড় তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’ 

চোখের সামনে প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে এখনো আঁতকে উঠছেন ৬৮ বছর বয়সী নেপালি নাগরিক কেশব প্রসাদ বারাল। ঘটনার চার-পাঁচ ঘণ্টা পর হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছান তিনি। কিন্তু বুকভরা আশা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও স্ত্রী আর ফিরে আসেননি।

কেশব বারালের মতো এমন বহু মানুষের জীবন মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে দিয়েছে নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস। 

উদ্ধার অভিযান ও ব্যাপক প্রাণহানি
গত বুধবার (২৬ আগস্ট) নদীর ওপর মাটি ও পাথরের বিশাল স্তূপ ধসে পড়ে এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায় বিস্তীর্ণ পাহাড়ি শহর ও উপত্যকা। 

নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত পর্যন্ত অন্তত ১৬০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ থাকায় উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। দুর্গম পার্বত্য এলাকা হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

বেঁচে ফেরা আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, কাজ করার সময় হঠাৎ করেই চোখের সামনে তার পুরো বাড়িটি ধসে পড়ে। চারপাশে কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মাঝে একটি আমগাছ আঁকড়ে ধরে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

নিখোঁজ ৪০০ পর্যটক, বেশিরভাগই বিদেশি
নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে চার শতাধিক পর্যটক রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৩৪০ জনই বিদেশি। তীর্থযাত্রী ও ট্রেকিংপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই অঞ্চলে নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন:
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক: ৪৭ জন
অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক: ৩৪ জন
যুক্তরাজ্যের নাগরিক: ৩৩ জন
কানাডার নাগরিক: ২৪ জন

নেপাল পর্যটন বোর্ডের মুখপাত্র সুনীল শর্মা জানান, নিখোঁজদের অনেকেই হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান—তিব্বতের কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী ছিলেন।

ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও সীমান্ত পরিস্থিতি
বন্যার পানির তোড়ে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকার সড়ক, বসতবাড়ি ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের অবকাঠামো ভেসে গেছে। অন্যদিকে, তিব্বতের গিরং কাউন্টির একটি সীমান্ত স্থলবন্দরেও বড় ধরনের ভূমিধস হয়েছে। চীনা কর্মকর্তারাও সেখানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যাচাইকৃত ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পানির প্রচণ্ড তোড়ে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষসহ মানুষ ভেসে যাচ্ছে।

দুর্যোগের কারণ নিয়ে যা জানা গেল
প্রাথমিকভাবে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহ ধসে এই বন্যা হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) বিষয়টি স্পষ্ট করে জানায়, ওই সময়ে কোনো প্রাকৃতিক টেকটোনিক ভূমিকম্প হয়নি। মূলত হিমবাহের বিশাল বরফ ও পাথরের স্তূপ ধসে পড়া এবং ধ্বংসাবশেষের তীব্র প্রবাহের কারণেই ভূকম্পনজনিত এই শক্তি উৎপন্ন ও রেকর্ড হয়েছিল।

বর্তমানে নেপাল সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় উদ্ধারকারী দল নিখোঁজ পর্যটক ও স্থানীয়দের সন্ধানে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।