ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

অনলাইন ডেস্কঃ
২৪ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৩১ এএম
শেয়ার করুন:
ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত মুখ ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রতিবেদনে হামলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, দীর্ঘ নজরদারি (রেকি), হামলা বাস্তবায়ন, সহযোগীদের ভূমিকা এবং সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার বিশদ বিবরণ উঠে এসেছে।

তদন্তে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া প্রধান শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলমগীর শেখ বর্তমানে ভারতে গ্রেপ্তার হয়ে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন।

নজরদারি ও হামলার প্রস্তুতি

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর হামলার বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই ফয়সাল ও আলমগীর হাদির গতিবিধির ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেন। অনুসারী, সাধারণ ভোটার কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর ছদ্মবেশে তারা হাদির খুব কাছাকাছি পৌঁছান এবং তার চলাচলের পথ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহ করেন।

এমনকি ৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির একটি বৈঠকে ফয়সালের উপস্থিতির প্রমাণও পেয়েছেন তদন্তকারীরা, যা হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঘটনার দিন যেভাবে চালানো হয় হামলা
দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিট: হাদি মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে প্রবেশ করেন।
দুপুর ১২টা ৫২ মিনিট: মোটরসাইকেল নিয়ে মসজিদের পাশের খলিল হোটেল গলিতে অবস্থান নেন ফয়সাল ও আলমগীর। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা তারা হাদির বের হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।
দুপুর ২টা ২৪ মিনিট: নামাজ শেষে হাদি অটোরিকশায় চড়ে রওনা হলে তাকে মোটরসাইকেলে অনুসরণ করা হয়। বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ফয়সাল অত্যন্ত কাছ থেকে হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। 

গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত ১০টায় তার মৃত্যু হয়।

হামলাকারীদের পরিচয় ও সহযোগী নেটওয়ার্ক
তদন্তে হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় স্পষ্ট হয়েছে:
ফয়সাল করিম মাসুদ (প্রধান শুটার): ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি।
মোহাম্মদ আলমগীর শেখ (মোটরসাইকেল চালক): আদাবর এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

হামলার আগের রাতে কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও উত্তরা এলাকায় সন্দেহজনক চলাচলের প্রমাণ পাওয়া যায়। অস্ত্র সংগ্রহ ও আশ্রয় দেওয়ায় তানজিমুল, আলীসহ বেশ কয়েকজনকে পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে। এছাড়া ঘটনার দিন ভোরে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের গ্রিন জোন কটেজে আসামিদের অবস্থানের তথ্যও মিলেছে।

ভারতে আত্মগোপন ও গ্রেপ্তার
হত্যাকাণ্ড সম্পাদনের পর দেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি চক্রের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ফয়সাল ও আলমগীর ভারতে পালিয়ে যান। এ কাজে ফিলিপ সাংমাসহ স্থানীয় কয়েকজন চোরাকারবারি সহায়তা করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। 

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স (STF) উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA) ও স্থানীয় গোয়েন্দারা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে অর্থদাতা ও নেপথ্য সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন।

অন্যদিকে, মূল পরিকল্পনাকারী পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পী ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই ভারতে অবস্থান করছেন। তদন্তে দাবি করা হয়, তিনি নাম ও জন্মসাল আংশিক পরিবর্তন করে ‘মো. মহিউদ্দিন চৌধুরী’ নামে ভারতীয় আধার ও প্যান কার্ড তৈরি করে কলকাতায় আত্মগোপনে রয়েছেন।

তদন্তের বর্তমান অবস্থা ও প্রত্যর্পণ জটিলতা
নারাজি আবেদন ও সিআইডির তদন্ত: ঘটনার ২১ দিনের মাথায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিলে তা প্রত্যাখ্যান করে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ। তাদের দাবি, মূল পরিকল্পনাকারী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করা হয়েছে। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে মামলাটির অধিকতর তদন্তভার পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তদন্ত প্রতিবেদন পেছানো: ভারত থেকে আইনি নথি সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ে বিলম্বের কারণে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ এ পর্যন্ত ১৮ বার পিছিয়েছে (সর্বশেষ ২০ আগস্ট ধার্য ছিল)।
প্রত্যর্পণে জটিলতা: বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারতে আসামিদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের মামলা চলমান থাকায় এবং বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে আইনি দিক থাকায় তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

ইনকিলাব মঞ্চের আলটিমেটাম
ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে হাদি হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করে বিচার নিশ্চিতের জোর দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।