আলফাডাঙ্গায় শালিসে 'বহিরাগত' আনার অভিযোগ: পরিবারকে সমাজচ্যুত, মসজিদেও বাধা

কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ
২৩ আগস্ট, ২০২৬ ৮:৪৩ পিএম
শেয়ার করুন:
আলফাডাঙ্গায় শালিসে 'বহিরাগত' আনার অভিযোগ: পরিবারকে সমাজচ্যুত, মসজিদেও বাধা

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা পৌরসভায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের শালিস বৈঠকে গ্রামের বাইরে থেকে লোক আনার অভিযোগে একটি পরিবারকে সামাজিকভাবে বর্জন (একঘরে) করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সমাজপতিদের বিরুদ্ধে। এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় মসজিদে নামাজ আদায়েও বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগী পরিবারটি আলফাডাঙ্গা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর নোয়াপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুর রফিক শেখের তিন ছেলে তারেক শেখ, ওবায়দুর শেখ ও খালিদ শেখের পরিবার।

ঘটনার বিবরণ: 
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রফিক শেখের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী ওসমান গনির দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। বিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে গত ২৪ জুলাই একটি শালিস বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য ৩০ জুলাই পুনরায় জমি পরিমাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়। 

অভিযোগ রয়েছে, জমি মাপার সময় রফিক শেখের পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রামের বাইরের কয়েকজন উপস্থিত থাকায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে ৩১ জুলাই একটি প্রাথমিক বৈঠক এবং পরবর্তীতে ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় চর নোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আবারও সভা বসে। 

ভুক্তভোগীদের দাবি, ওই সভায় সমাজপতিরা রফিক শেখের পরিবারকে সামাজিকভাবে বর্জনের সিদ্ধান্ত দেন। একই সঙ্গে গ্রামের কারও সাথে সামাজিক সম্পর্ক না রাখা, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করা এবং স্থানীয় মসজিদে নামাজ আদায় করতে নিষেধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য:
ভুক্তভোগী খালিদ শেখ বলেন, "জমির বিরোধ নিয়ে শালিসে আমাদের পক্ষের কথা বলার জন্য গ্রামের বাইরে থেকে কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন এসেছিলেন। কিন্তু এটিকে ইস্যু বানিয়ে গ্রাম্য মাতব্বররা আমাদের পুরো পরিবারকে সমাজচ্যুত করেছেন। আমাদের সঙ্গে গ্রামবাসীকে সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মসজিদে পর্যন্ত নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া হচ্ছে।"

সমাজপতি ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের বক্তব্য:
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সমাজপতি আবুল সরকার বলেন, "গ্রামের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে শালিস হলেও তারা বাইরে থেকে অনেক মানুষ নিয়ে এসেছিল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গ্রামের লোকজন তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরবর্তীতে তারা আমার কাছে এসেছিল, আমি তাদেরকে গ্রামের মানুষের কাছে গিয়ে ভুল স্বীকার করার পরামর্শ দিয়েছি।"

স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর আজিজুল তালুকদার বলেন, "দুই দফা জমি পরিমাপের সময় আমি শালিসে উপস্থিত ছিলাম। তবে পরবর্তীতে পরিবারটিকে সামাজিকভাবে বর্জন বা সমাজচ্যুত করার বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি।"

আলফাডাঙ্গা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান হাসিব বলেন, "কাউকে সামাজিকভাবে বর্জন করা কোনোভাবেই মানবিক কিংবা আইনসম্মত নয়। ঘটনাটি আমি শুনেছি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।"

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য:
আলফাডাঙ্গা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আল-আমিন বলেন, "বিষয়টি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে কারও বিচার করার কিংবা নাগরিক অধিকার হরণ করার সুযোগ নেই।"

বর্তমান পরিস্থিতি:
এদিকে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। সচেতন মহল জমি বিরোধের জেরে একটি পরিবারকে সামাজিকভাবে বর্জন ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ করার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। 

ভুক্তভোগী পরিবারটি এ বিষয়ে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং তাদের স্বাভাবিক সামাজিক ও নাগরিক জীবন নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।