শিশুদের খাবারের প্রতিবাদ করায় সহকারী শিক্ষকের দুই পা ভেঙে দিলেন প্রধান শিক্ষকের স্বজনরা

আলমাস বেপারী, কালকিনি প্রতিনিধি, মাদারীপুরঃ
২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১১:০৫ এএম
শেয়ার করুন:
শিশুদের খাবারের প্রতিবাদ করায় সহকারী শিক্ষকের দুই পা ভেঙে দিলেন প্রধান শিক্ষকের স্বজনরা

প্রায় দুই মাস ধরে বিছানায় শুয়েই কাটছে দিন-রাত। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক সব কাজ—সবকিছুই এখন বিছানায় পরনির্ভরশীল। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত 'স্কুল ফিডিং'-এর খাবার আত্মসাতের প্রতিবাদ করাই যেন কাল হয়েছিল এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের জীবনে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের স্বজনদের বর্বরোচিত হামলায় দুই পা ভেঙে এখন পঙ্গুত্ব বরণ করতে বসেছেন তিনি। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার শিক্ষকতা জীবনের ভবিষ্যৎ। কবে নাগাদ সুস্থ হয়ে আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে চিকিৎসকরাও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয়রা।

জানা যায়, কালকিনি উপজেলার ১৫৮ নম্বর চর আলীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লিপি বেগমের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি টিফিন (স্কুল ফিডিং) বিতরণ নিয়ে সহকারী শিক্ষক ইমাম হোসেন রাজনের বিরোধ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের খাবার নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতেন, যার প্রতিবাদ করেন রাজন। এরই জেরে গত ২ জুলাই বিদ্যালয় ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে পশ্চিম আলীপুরের খেয়াঘাট এলাকায় রাজনের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে তার ভাই মিলন মোল্লা ও তার ভাড়াটে লোকজন লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে রাজনকে পিটিয়ে দুই পা ভেঙে দেয় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করে।

ঘটনার পর রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা রাজনকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। অবস্থার অবনতি হলে ওই রাতেই তাকে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘ এক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে বাধ্য হয়ে তাকে গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। 

ভুক্তভোগী শিক্ষক ইমাম হোসেন রাজন আক্ষেপ করে বলেন, "শিক্ষার্থীদের স্কুল ফিডিংয়ের খাবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়মিত বাড়িতে নিয়ে যেতেন। আমি শুধু কোমলমতি শিশুদের অধিকার রক্ষায় এর প্রতিবাদ করেছিলাম। আর এটাই আমার অপরাধ হলো! তার নির্দেশে তার ভাই মিলন মোল্লা ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে এসে আমার দুই পা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আমি এই নির্মম হামলার সুষ্ঠু ও কঠিন বিচার চাই।"

মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী শিক্ষকের বাবা মাজেদ আলী শিকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার ছেলের ওপর সন্ত্রাসী কায়দায় পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে। সে আর কখনো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবে কি না, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। এমন বর্বরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। হামলার নির্দেশদাতা ও হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লিপি বেগম। তিনি দাবি করেন, "আমি কিংবা আমার ভাই এই ঘটনার সাথে কোনোভাবেই জড়িত নই। সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে না এসেই একটি মনগড়া তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। সেই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই জেলা শিক্ষা অফিস আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছে। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার, সত্যের জয় হবেই।"

আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জহিরুল আলম জানান, "ভুক্তভোগী শিক্ষকের বাবার দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত ৫ জন আসামি বর্তমানে আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। মামলার তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে হাসপাতাল থেকে মেডিকেল সনদ (ভিকটিমের জখমী সনদ) হাতে এসেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।"

এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফজলে এলাহী বলেন, "একজন সহকর্মী শিক্ষকের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও অগ্রহণযোগ্য। কালকিনির সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রবীন্দ্র নাথ দত্তের সরেজমিন তদন্তে ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের আলোকেই অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।