মহম্মদপুরে মধুমতির তীব্র ভাঙনে বিলীন ভিটেমাটি ও আবাদি জমি, ঝুঁকিতে ২০ গ্রাম

বিশ্বজিৎ সিংহ রায়, স্টাফ রিপোর্টার, মাগুরাঃ
২৬ আগস্ট, ২০২৬ ১১:২৬ এএম
শেয়ার করুন:
মহম্মদপুরে মধুমতির তীব্র ভাঙনে বিলীন ভিটেমাটি ও আবাদি জমি, ঝুঁকিতে ২০ গ্রাম

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা ভারী বর্ষণে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় মধুমতি নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর রাক্ষুসী রূপের মুখে একের পর এক বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে নদীপাড়ের শত শত পরিবার। গৃহহীন হয়ে অনেকের ঠাঁই হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে, আর ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদী তীরবর্তী অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের এই কর্মকাণ্ডের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বর্ষা মৌসুমে মধুমতি নদী ভয়াবহ রূপ ধারণ করে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, গাছপালা ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন করে দিচ্ছে।

সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার উত্তরে চরসেলামতপুর থেকে শুরু করে দক্ষিণে কালিশংকরপুর পর্যন্ত বিশাল এলাকা এখন তীব্র ভাঙনের মুখে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন গোপালনগর, মহেশপুর, হরেকৃষ্ণপুর, ঝামা, চরঝামা, আড়মাঝি, যশোবন্তপুর, চরপাচুড়িয়া, রায়পুর, মুরাইল, ধুপুড়িয়া, জাঙ্গালিয়া, রুইজানি, কাশিপুর, ধুলজুড়ি, দ্বিগমাঝি, দেউলি ও ভোলানাথপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের বাসিন্দা। এছাড়া ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, ঈদগাহ, মন্দির এবং স্থানীয় হাট-বাজার।

ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায় মানুষের চোখে-মুখে চরম অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তার ছাপ। উপজেলার হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের তহিদুল ইসলাম লিপন ও তার স্ত্রী নাসরিন সুলতানা জানান, এ পর্যন্ত তাঁদের ১০ থেকে ১২ একর জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। ইতোমধ্যে পাঁচবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। এ বছরও ভাঙন আশঙ্কায় পাশের জমিতে সাময়িকভাবে ঘর তুলে কোনোমতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তাঁরা। 

একই গ্রামের স্বামীহারা নুর নাহার আক্ষেপ করে বলেন, “বর্ষা মৌসুম আসলেই আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। চারবার বাড়ি সরিয়েছি। ফসলি জমি ও গাছপালা হারিয়ে এখন আমি পুরোপুরি নিঃস্ব ও দিশেহারা।” 

ভ্যানচালক ইনামুল শেখ বলেন, “তিনবার বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। নিজস্ব কোনো জমি না থাকায় এখন অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকি। ভ্যান চালিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চলছে।”

এদিকে মধুমতি নদীর ভাঙন পরিস্থিতি বিবেচনায় গত ১৯ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী। এ সময় তিনি ৩০০ মিটার এলাকাজুড়ে চলমান জিওব্যাগ ডাম্পিং কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থায়ী ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, ভাঙন ঠেকাতে সাময়িক জিওব্যাগ ডাম্পিং কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। নতুন করে পরিবারগুলোর ভূমিহীন হওয়া ঠেকাতে এবং মহম্মদপুরের মানচিত্র রক্ষায় অবিলম্বে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদীশাসন বাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।