যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দিশাহারা নেপাল

অনলাইন ডেস্কঃ
২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১১:০০ এএম
শেয়ার করুন:
যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দিশাহারা নেপাল

পাহাড়ি ঢল ও তীব্র স্রোতের তোড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে নেপালের বিস্তীর্ণ জনপদ। আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ফলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। প্রাণ হারিয়েছেন অনেক মানুষ। তবে এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এমন প্রলয়ংকরী বন্যার সূত্রপাত ঠিক কীভাবে হলো? 

বন্যার প্রকৃত উৎস ও কারণ নিশ্চিত করতে না পেরে নেপাল ও চীন—উভয় দেশের বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনই এখন ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে।

কারণ নিয়ে বিভ্রান্তি: ভূমিকম্প, হিমবাহ ধস নাকি অতিবৃষ্টি?

দুর্যোগের শুরুতে তিব্বতে আঘাত হানা ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পকে বন্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS)-এর তথ্যানুযায়ী, নেপালের গোসাইকুণ্ডা থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়। এর মাত্র তিন মিনিট পর (সকাল ৮টা ৪০ মিনিট) পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যার খবর পাওয়া যায়। তবে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল পার্লামেন্টে জানান, সময়ের ব্যবধান এত কম হওয়ায় ভূমিকম্পের সঙ্গেই বন্যার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা আরও যাচাই করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (NDRRMA) স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে ভিন্ন একটি সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তাদের মতে, নেপাল-চীন সীমান্তের রসুওয়াগাধির কাছে একটি হিমবাহে পাথর ও বরফধসের কারণে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ ও পানির ঢল লহেন্দে নদী হয়ে ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে। 

এছাড়া তিব্বতের মানস সরোবর ও আলি এলাকায় আগের দিন হওয়া ভারী বৃষ্টিপাতও এই বন্যার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে খতিয়ে দেখছে বেইজিং ও নেপালের বৈজ্ঞানিক দল।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায় ব্যাহত তদন্ত

লাসায় নিযুক্ত নেপালের কনসাল জেনারেল লক্ষ্মী প্রসাদ নিরাউলা জানান, দুর্যোগকবলিত সীমান্ত এলাকায় সড়ক নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। খারাপ আবহাওয়া ও যোগাযোগহীনতার কারণে নেপাল বা চীন কোনো দেশের নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা বিজ্ঞানীদের দলই দ্রুত সরেজমিন নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে বন্যার সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থল ও সঠিক কারণ চিহ্নিত করতে হিমশিম খাচ্ছে উভয় পক্ষ।

আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার ঘাটতি

এই দুর্যোগের পর হিমবাহ হ্রদের পানি হঠাৎ বের হয়ে আসা বা ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ (GLOF) ঝুঁকি এবং সীমান্তবর্তী যৌথ সতর্কীকরণ ব্যবস্থার অভাব আবারও সামনে এসেছে। 

গত বছরের জুলাইয়েও একই অঞ্চলে একটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে ব্যাপক প্রাণহানি ও ‘মিতেরি ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ ভেসে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনার পর নেপাল ও চীন সীমান্ত এলাকায় তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার বিষয়ে একমত হলেও তা নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। কার্যকর সতর্কবার্তা ব্যবস্থার অভাবেই বারবার এমন ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সহায়তায় এগিয়ে এসেছে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংক

ভয়াবহ এই দুর্যোগে শত শত কোটি রুপির সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রসুওয়া ও ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের ইতোমধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। 

এদিকে নেপালের সংকটময় এই পরিস্থিতিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে প্রতিবেশী দেশসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো:
ভারত: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গভীর শোক প্রকাশ করে নেপালের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভারতীয় বিমানবাহিনীর সি-১৭ ও সি-১৩০ পরিবহন বিমান ত্রাণসামগ্রী, ওষুধ, মাটি কাটার যন্ত্রপাতি এবং বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল নিয়ে নেপালে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র: বেইজিং ও ওয়াশিংটন উদ্ধার ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে সম্ভাব্য সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও জরুরি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক: জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।