ছুটির ঘণ্টা: শৈশবের মায়াবী সুর ও সোনালি স্মৃতির প্রতিধ্বনি

বিশ্বজিৎ সিংহ রায়, স্টাফ রিপোর্টার, মাগুরাঃ
২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০৮ পিএম
শেয়ার করুন:
ছুটির ঘণ্টা: শৈশবের মায়াবী সুর ও সোনালি স্মৃতির প্রতিধ্বনি

ছুটির ঘণ্টা কেবলই বিদ্যালয় ছুটির কোনো সাধারণ সংকেত নয়; এটি যেন ফেলে আসা সোনালি শৈশবের দরজায় কড়া নাড়া এক মায়াবী সুর। আজও পথ চলতে গিয়ে কোথাও স্কুলের ঘণ্টার ধ্বনি কানে এলে মুহূর্তেই মনে ভেসে ওঠে ছোট্টবেলার সেই দিনগুলো—কাঁধে ভারী ব্যাগ, হাতে মলাট দেওয়া বই আর বুকভরা আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার সেই দুরন্ত অনুভূতি।

সেদিন শেষ ক্লাসে শিক্ষকের পাঠে কিংবা বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও অবুঝ মনটি পড়ে থাকত দেয়ালঘড়ির কাঁটায়। অপেক্ষা কেবল সেই কাঙ্ক্ষিত শব্দের—কখন বাজবে ছুটির ঘণ্টা! অবশেষে 'টং টং' শব্দে ঘণ্টা বেজে উঠলেই পুরো শ্রেণিকক্ষে নেমে আসত এক অদ্ভুত চাঞ্চল্য। এক মুহূর্তেই শুরু হতো বাড়ি ফেরার তাড়া; কেউ মেতে উঠত সহপাঠীর সঙ্গে প্রাণখোলা আড্ডায়, আবার কেউবা মাঠের এক কোণে মেতে উঠত খেলায়। সামান্য কয়েকটি মুহূর্তের ভেতরেই লুকিয়ে থাকত যেন গোটা এক পৃথিবীর আনন্দ।

শৈশবের সেই আনন্দ ছিল বড়ই সহজ ও নির্মল। টিফিনের খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়া, মাঠে ধুলোবালি মেখে দৌড়ঝাঁপ, তুচ্ছ কারণে ক্ষণিকের অভিমান এবং পরক্ষণেই আবার হাসিমুখে জড়িয়ে ধরা—এসবের মধ্যেই ছিল ভালোবাসার নিখাদ প্রকাশ। তখন সুখের পরিধি খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার গভীরতা ছিল অন্তহীন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর পঙ্‌ক্তি—*“আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে”*—ঠিক যেন শৈশবের সরল, ছন্দময় ও আপন সৌন্দর্যে ভরা দিনগুলোরই রূপক। অন্যদিকে কবি জীবনানন্দ দাশের *“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায়”* কবিতার মতোই আজকের নাগরিক ব্যস্ততায় বন্দি মানুষগুলোও বারবার ফিরে যেতে চায় তাদের সেই চেনা বিদ্যালয় চত্বরে। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, *“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি”*—শিশুর সেই নির্মল পৃথিবীর মতোই সুন্দর ছিল আমাদের শৈশব। সেখানে জীবনের কোনো জটিল সমীকরণ বা হিসাব-নিকাশ ছিল না; ছিল কেবল বন্ধুত্ব, স্বপ্ন, উচ্ছ্বল হাসি আর আগামী দিনের অচেনা আনন্দ।

কালের নিয়মে সেই দিনগুলো আজ স্মৃতিতে বন্দি। বিদ্যালয়ের পরিচিত বেঞ্চগুলো বদলেছে, প্রিয় সহপাঠীরা ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের নানা প্রান্তে, আর শৈশবের নিষ্পাপ মানুষগুলোও আজ বাস্তবতার কঠিন স্রোতে হারিয়ে গেছে। তবুও কোনো এক অলস দুপুরে স্কুলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠলে মনে হয়—সময় যেন মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। মনের কোণে ভেসে ওঠে, এই বুঝি আবার কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছুটছি বাড়ির চেনা মেঠোপথে।

ছুটির ঘণ্টা তাই কেবল একটি শব্দ নয়—এটি শৈশব, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও নির্মল আনন্দের এক অমলিন সুর। যে সুরের বয়স হয়তো ফুরিয়েছে বহু বছর আগে, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে তা আজও সমান মুগ্ধতায় বেজে চলেছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।