নেপালে বন্যায় নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ চার শতাধিক

অনলাইন ডেস্কঃ
২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৫৭ এএম
শেয়ার করুন:
নেপালে বন্যায় নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ চার শতাধিক

নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আকস্মিক ও প্রলয়ংকরী বন্যায় নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৭ জনে। এ ঘটনায় এখনো অন্তত ৪০৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি পর্যটক ও পুণ্যার্থী। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা এপি নেপাল পুলিশের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

নিখোঁজের তালিকায় শতাধিক বিদেশি পর্যটক
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ৩৪১ জন বিদেশির মধ্যে রয়েছেন ১৩৩ জন ভারতীয়, ৪৭ জন মার্কিন, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয়, ৩৩ জন ব্রিটিশ ও ২৪ জন কানাডীয় নাগরিক। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও রাশিয়ার বেশ কয়েকজন নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ এই বিদেশি নাগরিকদের একটি বড় অংশ তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতের উদ্দেশে তীর্থযাত্রায় যাচ্ছিলেন।

স্থানীয় নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৬২ জন নেপালি নাগরিক রয়েছেন, যাঁরা রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদ এলাকায় একটি ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া দুর্যোগস্থলে দায়িত্ব পালনকালে নেপাল পুলিশের অন্তত ২৮ সদস্যও নিখোঁজ হয়েছেন।

যেভাবে শুরু হলো বিপর্যয় ও ক্ষয়ক্ষতি
গত বুধবার সকাল ৯টার দিকে নেপালের রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ তীব্র পাহাড়ি ঢল নামে। চোখের পলকে পানি, কাদা, পাথর ও বরফের প্রবল স্রোত নদীতীরবর্তী জনপদে আছড়ে পড়ে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে বেশ কয়েকটি গ্রাম, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় অন্তত ১৯টি সেতু সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে ত্রিশূলী নদীর পানি কোনো কোনো স্থানে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

কাঠমান্ডুভিত্তিক পরিবেশ ও জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (ICIMOD)-এর বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, হিমবাহ থেকে নেমে আসা বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে সাময়িক বাঁধ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই বাধা ভেঙে প্রবল বেগে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিম্নাঞ্চলে নেমে আসায় এই আকস্মিক দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। শুরুতে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও পরবর্তী পর্যবেক্ষণে বন্যার আগে কোনো ভূমিকম্পের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

উদ্ধার তৎপরতা ও সার্বিক পরিস্থিতি
দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর প্রায় ১ হাজার ৭০০ সদস্য উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছেন এবং আরও সাড়ে ছয় শতাধিক সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত অন্তত ১১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে মারাত্মক বেগ পোহাচ্ছে।

সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতের গিরং এলাকাতেও ভূমিধসে অন্তত ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ২৬৫ জন। ফলে নেপাল ও চীন মিলিয়ে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোট প্রাণহানির সংখ্যা ১৬০ ছাড়িয়েছে।

ত্রাণ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই জাতীয় দুর্যোগে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে দুর্গতদের উদ্ধার, চিকিৎসা, খাদ্য ও আশ্রয়ের পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। 

নেপাল সরকারের অনুরোধে উদ্ধারকাজে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে প্রতিবেশী ভারত ও চীন। এছাড়া জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও দুর্গত এলাকায় জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। বন্ধুপ্রতিম নেপালের এই সংকটময় মুহূর্তে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ এবং যেকোনো ধরনের উদ্ধার ও মানবিক ত্রাণ সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।