কালকিনিতে আদালতের আদেশ অমান্য করে মার্কেট দখলের অভিযোগ: অবরুদ্ধ দোকানপাট, ঝুঁকিতে ব্যবসায়ীরা

আলমাস বেপারী, কালকিনি প্রতিনিধি, মাদারীপুরঃ
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১:০৩ পিএম
শেয়ার করুন:
কালকিনিতে আদালতের আদেশ অমান্য করে মার্কেট দখলের অভিযোগ: অবরুদ্ধ দোকানপাট, ঝুঁকিতে ব্যবসায়ীরা

মাদারীপুরের কালকিনিতে থানার মাত্র ১০০ গজের মধ্যে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে একটি মার্কেট ও বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। কালকিনি ফাজিল মাদ্রাসা ও সদর প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন দক্ষিণ পাশে অবস্থিত মৃত লাল মিয়া সরদারের পৈতৃক সম্পত্তিতে এ ঘটনা ঘটে। আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশ থাকা সত্ত্বেও মার্কেটের সামনে ইটের স্তূপ ফেলে দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

সরেজমিন চিত্র:
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় দুই যুগ আগে সাইদুল কবির গংদের নির্মিত মার্কেটটির দোকানগুলোর শাটারের ঠিক সামনে পরিকল্পিতভাবে ইটের স্তূপ ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা দোকান খুলতে পারছেন না। 

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানান, কিছুদিন আগে আব্দুল আলীম নামের এক ব্যক্তি রাতের আঁধারে দোকানের সামনে এই ইটের স্তূপ ফেলে যান। জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সাধারণ ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাছাড়া দোকানের ভেতরে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সিলিন্ডার রয়েছে, যা যথাযথ তদারকির অভাবে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। ব্যবসা সচল রাখতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

মামলা ও আইনি প্রেক্ষাপট:
মামলার বিবরণী সূত্রে জানা যায়, চর ঠেঙ্গামারা মৌজার বিআরএস ৫১৯ নং খতিয়ানের ৩ ও ৪ নং দাগের রেকর্ডিও মালিক মৃত আব্দুল সামাদ সরদারের পাঁচ পুত্র ও চার কন্যা। আব্দুল সামাদ সরদারের দুই স্ত্রী তাদের প্রাপ্ত সম্পত্তি বড় ছেলে লাল মিয়া সরদারকে (আব্দুস সালাম) রেজিস্ট্রি দলিল করে দেন। ওয়ারিশরা যার যার অংশ ভোগদখল করে আসছিলেন। এর মধ্যে জমি নিয়ে আদালতে চৌহদ্দি নির্ধারণের একটি মামলা (নং ৩৪৬/২০২০) চলমান থাকা অবস্থাতেই গত ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে (দলিল নং ৩৩৮০/২০২৫) বিআরএস রেকর্ডীয় মালিক ফাতেমা খাতুনের ওয়ারিশগণ আব্দুল আলীম নামের এক ব্যক্তির কাছে ৮.৬৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে লাল মিয়া সরদারের পুত্রগণ মুসলিম আইনের বিধান অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে ভূমি অগ্রক্রয়ের মামলা (নং ১০৩/২০২৫) দায়ের করেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, মামলা দায়েরের পর থেকেই সাইদুল কবির গংদের ওপর নানা প্রকার হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছিল।

পরবর্তীতে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে গত ২৩ মে ২০২৬ তারিখে মাদারীপুর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় একটি পিটিশন (নং ৬১৯/২৬) দায়ের করা হয়। আদালত কালকিনি সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিলে এসিল্যান্ডের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—নালিশি ভূমিতে বাদী সাইদুল কবির গং দখলে রয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নালিশি ভূমিতে উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) আদেশ প্রতিপালনের নির্দেশ প্রদান করেন।

উভয় পক্ষের বক্তব্য:
মার্কেট মালিক সাইদুল কবির বলেন, “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। অতীতে আমাদের ওপর একাধিকবার হামলা-মামলা হলেও আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করিনি। আদালত আমাদের পক্ষে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এসিল্যান্ডের তদন্তেও আমাদের দখলের সত্যতা পাওয়া গেছে। তা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষ গায়ের জোরে মার্কেট বন্ধ করে দখলের পাঁয়তারা করছে।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল আলীম বলেন, “মূল মালিকদের কাছ থেকেই আমি জমি ক্রয় করেছি এবং পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতেই তারা আমাকে জায়গা বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন। বরং প্রতিপক্ষ দুই দিন আগে আমার তালা দেওয়া দোকান ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছে।”

পুলিশের বক্তব্য:

কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলম বলেন, “ঘটনাস্থলে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে পুলিশ কাজ করছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে গত পরশু ঘটনাস্থলে গিয়ে সাময়িকভাবে দোকান বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।” আদালতের স্থিতাবস্থার নির্দেশের পরও চলমান দোকানপাট বন্ধ রাখা যায় কি না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, “আদালত থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসে যদি দোকান খোলার নির্দেশ দেন, তবে আমরা দোকান খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।