ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ: ফিরে দেখা এক শতাব্দীর পথচলা

মোঃ রহমতুল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫:০৯ পিএম
শেয়ার করুন:
ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ: ফিরে দেখা এক শতাব্দীর পথচলা

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও আধুনিক ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনের অন্যতম রূপকার মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী (রহ.)-এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ (২২ সেপ্টেম্বর)। ১৯৭৯ সালের এই দিনে তিনি পার্থিব জীবনের ইতি টানেন। 

জ্ঞানচর্চা, গভীর গবেষণা ও বিশ্বমানবতার কাছে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপ তুলে ধরার পেছনে তাঁর গোটা জীবন উৎসর্গীকৃত ছিল। সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে ইসলামী রাজনীতির নেতৃত্ব—তাঁর সমগ্র জীবন ছিল বহুমুখী সংগ্রাম ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপে পূর্ণ। 

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নিচে তাঁর কর্মবহুল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

শৈশব, শিক্ষা ও সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি (১৯০৩–১৯২৮)

১৯০৩ (২৫ সেপ্টেম্বর): ভারতের হায়দরাবাদের আওরঙ্গবাদে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯১৮: মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিজনৌরের একটি পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন।
১৯২০: মধ্যপ্রদেশের জবলপুর থেকে প্রকাশিত 'তাজ' পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯২১: খিলাফত আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং দিল্লিতে মাওলানা আব্দুস সালাম নিয়াজির কাছে আরবি ভাষার উচ্চতর পাঠ গ্রহণ করেন।
১৯২৩-১৯২৫: জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মুখপত্র ‘দৈনিক মুসলিম’ এবং পরবর্তীতে ইংরেজি সরকারের নিষেধাজ্ঞার পর নতুন চালু হওয়া ‘আল জামিয়ত’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯২৬-১৯২৮: দিল্লির ঐতিহ্যবাহী 'দারুল উলুম ফতেহপুরি' থেকে উচ্চতর সনদ (উলুম-এ-আকালিয়া ওয়া নাকালিয়া, জামে তিরমিযি ও মুয়াত্তা ইমাম মালিক) লাভ করেন।
১৯২৭-১৯২৮: 'আল জামিয়ত' পত্রিকায় তাঁর বিখ্যাত গবেষণাধর্মী ধারাবাহিক ‘আল জিহাদ ফিল ইসলাম’ লেখা শুরু করেন। পরবর্তীতে কংগ্রেসের সাথে নীতিগত অমিল হওয়ায় জমিয়তের পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব ছেড়ে দেন এবং স্বাধীন জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।

সাহিত্য সাধনা, জামায়াত প্রতিষ্ঠা ও ভারত বিভাগ (১৯৩০–১৯৪৭)

১৯৩০: 'আল জিহাদ ফিল ইসলাম' পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়, যা ভারতীয় সীমানা ছাড়িয়ে মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন তোলে।
১৯৩২: হায়দরাবাদ থেকে ঐতিহাসিক মাসিক পত্রিকা 'তরজুমানুল কুরআন' প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার মাধ্যমেই উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবি ও দার্শনিক আল্লামা ড. মুহাম্মাদ ইকবালের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৯৩৭ (১৫ মার্চ): দিল্লির সম্ভ্রান্ত পরিবারের মাহমুদা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯৩৮: আল্লামা ইকবালের পরামর্শ ও সহযোগিতায় পাঠানকোটের 'দারুল ইসলাম ট্রাস্ট' গঠন করে জ্ঞানতাত্ত্বিক কাজ এগিয়ে নেন। একই বছর জমিয়তের অখণ্ড ভারতের ধারণার বিপরীতে ‘মাসয়ালায়ে কওমিয়াত’ গ্রন্থ লিখে পৃথক মুসলিম জাতীয়তাবাদের পক্ষে যৌক্তিক রূপরেখা দেন।
১৯৪১ (২৬ আগস্ট): লাহোরে ৭৫ জন সঙ্গীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন 'জামায়াতে ইসলামী হিন্দ' এবং সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম আমীর নির্বাচিত হন।
১৯৪২: তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক কীর্তি কুরআন মাজিদের তাফসির 'তাফহীমুল কুরআন' রচনা শুরু করেন।
১৯৪৭: ভারত ভাগের পর সংগঠনও দুই দেশে বিভক্ত হয়। মাওলানা মওদূদী পাকিস্তানে হিজরত করে 'জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান'-এর আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

শাসনতন্ত্র আন্দোলন, কারাগার ও মৃত্যুদণ্ডাদেশ (১৯৪৮–১৯৫৮)

১৯৪৮-১৯৫০: পাকিস্তানে ইসলামী সংবিধান ও ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েমের দাবিতে জোরালো আন্দোলন শুরু করেন। এর জেরে পাকিস্তান সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করে। তবে ১৯৪৯ সালে সরকার জামায়াতের প্রস্তাবিত 'ইসলামী সংবিধানের মূলনীতি/রূপরেখা' গ্রহণে বাধ্য হয়। ১৯৫০ সালে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
১৯৫৩: 'কাদিয়ানী সমস্যা' বইটি রচনা করে কাদিয়ানী/আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার যৌক্তিক দাবি তুলে ধরেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে সামরিক আদালতে ফাঁসির আদেশ দেয়।
১৯৫৩-১৯৫৫: ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে তৎকালীন গোটা মুসলিম বিশ্বে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আন্তর্জাতিক চাপে সরকার মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন করে এবং ১৯৫৫ সালে তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

আন্তর্জাতিক প্রভাব ও সামরিক শাসনবিরোধী লড়াই (১৯৫৬–১৯৭২)
১৯৫৬: দামেস্কে অনুষ্ঠিত 'মুতামারে আলমে ইসলামী' সম্মেলনে যোগদান করেন।
১৯৫৮: জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে জামায়াতসহ সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন।
১৯৫৯: কুরআনে উল্লেখিত ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক স্থানগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন।
১৯৬০: মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গঠিত আন্তর্জাতিক কমিটির সদস্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম (সিলেবাস) প্রণয়নে অসামান্য ভূমিকা রাখেন।
১৯৬২-১৯৬৭: রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার ও গণতন্ত্রের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই সময়ে আইয়ুব সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি ১৯৬৪ ও ১৯৬৭ সালে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবন্দী হন।
১৯৭২: একটানা দীর্ঘ ৩০ বছর সাধনার পর ৬ খণ্ডের কালজয়ী তাফসির গ্রন্থ 'তাফহীমুল কুরআন' রচনা সম্পন্ন করেন। একই বছর শারীরিক অসুস্থতার কারণে জামায়াতের আমীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

জীবনের শেষ দিনগুলো ও চিরবিদায় (১৯৭৮–১৯৭৯)
১৯৭৮: তাঁর রচিত শেষ মৌলিক মাস্টারপিস বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পূর্ণাঙ্গ সীরাত গ্রন্থ 'সিরাতে সারওয়ারে আলম' প্রকাশিত হয়।
১৯৭৯ (২২ সেপ্টেম্বর): গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থানকালে এই মহান মনীষী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

পরবর্তীতে তাঁর মরদেহ পাকিস্তানে এনে লাহোরের ইছরায় ঐতিহাসিক জানাজা শেষে সমাহিত করা হয়। তাঁর রচিত শতাধিক গ্রন্থ বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে আজও বিশ্বব্যাপী ইসলামী চিন্তাধারায় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।