সৌদিতে সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: আত্রাইয়ের ১৩ রেমিট্যান্স যোদ্ধার মর্মান্তিক মৃত্যু, এলাকায় শোকের ছায়া

আব্দুল মজিদ মল্লিক, জেলা প্রতিনিধি, নওগাঁঃ
১০ আগস্ট, ২০২৬ ২:০৫ পিএম
শেয়ার করুন:
সৌদিতে সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: আত্রাইয়ের ১৩ রেমিট্যান্স যোদ্ধার মর্মান্তিক মৃত্যু, এলাকায় শোকের ছায়া

পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো আর একটু স্বচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে বুক ভরা আশা বেঁধে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রবাসী ভাইয়েরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে এভাবে এক লহমায় ছাই হয়ে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি তাদের পরিবার। সৌদি আরবের রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১৭ জন বাংলাদেশি। এর মধ্যে কেবল নওগাঁর আত্রাই উপজেলারই রয়েছেন ১৩ জন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। এই মর্মান্তিক ঘটনায় আত্রাই জুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া; কেড়ে নিয়েছে ১৩টি পরিবারের সব স্বপ্ন, স্বজনদের শেষ আশ্রয়স্থল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত রোববার দুপুর ২টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদ শহরের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তে আগুন পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়লে সেখানে কর্মরত শ্রমিকরা আটকা পড়েন।

সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায় শোকের হৃদয়বিদারক দৃশ্য। এই গ্রামের একই পরিবারের দুই ভাই—মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন। দুই ছেলেকে হারিয়ে মা ময়না খাতুনের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। 

সন্তানদের শেষ আকুতির কথা মনে করে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মা ময়না খাতুন বলেন, "ঘটনার দিন সকালে মেজ ব্যাটার (সুমন) সাথে কথা হইছিল। বলছিল, ‘ভালোই আছি মা, তুমি ভাত খাও, সুস্থ থাকো।’ কিন্তু আগুন লাগার পর যখন ফায়ার সার্ভিস আসছিল না, তখন ছাওয়াল আমাকে শেষ ভয়েস মেসেজ পাঠায়। ভয়েসে বলেছিল, ‘মা, দুইডা কথা কমু, আর কথা কমু না নে মা। আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি।’"

বুকচাপড়ে মা ময়না খাতুন আকুতি জানান, "আমার দুই বাবা রে আমার বুকে এনে দেও। সন্তানদের লাশ দেখে আমি কলিজা ঠান্ডা করমু। মোহন তো বলেছিল, ‘দেশে এসে বিয়া করমু মা, মেয়ে দেখো।’ আজ আমার সেই স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল!"

অগ্নিকাণ্ডের এ ঘটনায় কেবল গন্ডগোহালী গ্রামেই দুই ভাইসহ মোট চারজন নিহত হয়েছেন। 

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরাজ্জামান জানান, রিয়াদের সোফা কারখানায় আগুনে পুড়ে আত্রাই উপজেলার এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে এবং মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ ও সমন্বয় করা হচ্ছে।

আত্রাইয়ের যে ১৩ রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন:
১. মো. জালাল — পারকাসুন্দা গ্রাম, পাঁচুপুর ইউনিয়ন (মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে)  
২. মো. মোহন প্রামাণিক — গন্ডগোহালী গ্রাম, কালিকাপুর ইউনিয়ন (মো. গুফফার প্রামাণিকের ছেলে)  
৩. মো. সুমন প্রামাণিক — গন্ডগোহালী গ্রাম, কালিকাপুর ইউনিয়ন (মো. গুফফার প্রামাণিকের ছেলে)  
৪. মো. রুবেল হোসেন — গন্ডগোহালী গ্রাম, কালিকাপুর ইউনিয়ন (জান্নার ছেলে)  
৫. মো. কলিউদ্দিন প্রামাণিক — গন্ডগোহালী গ্রাম, কালিকাপুর ইউনিয়ন (মো. ফজলুর ছেলে)  
৬. মো. সুমন হোসেন — ডুবাই গ্রাম, বিশা ইউনিয়ন (বাদলের ছেলে)  
৭. মো. হাসিবুল হাসান শুভ — ডুবাই গ্রাম, বিশা ইউনিয়ন (চঞ্চলের ছেলে)  
৮. সোহেল রানা — ডুবাই গ্রাম, বিশা ইউনিয়ন  
৯. মো. সাগর হোসেন — সাধনগর গ্রাম, বিশা ইউনিয়ন  
১০. মো. মজিদুল ইসলাম — মাধবপুর গ্রাম, বিশা ইউনিয়ন (মজনু মিয়ার ছেলে)  
১১. মো. মহিদুল ইসলাম — খরসুতি গ্রাম, বিশা ইউনিয়ন  
১২. মো. ফরিদ শেখ — উদনপৈ গ্রাম, সাহাগোলা ইউনিয়ন (মো. ময়েন শেখের ছেলে)  
১৩. মো. মিনহাজ — মধ্যবোয়ালিয়া গ্রাম, পাঁচুপুর ইউনিয়ন  

পর পর এতগুলো তর তাজা প্রাণের এমন করুণ বিদায়ে পুরো আত্রাই উপজেলায় বইছে কান্নার রোল। স্বজনদের আকুল দাবি—দ্রুত যেন প্রিয়জনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।