ঘুন পোকার গুঁড়োর সূত্রে ১৬ ঘণ্টায় ক্লুলেস হত্যা রহস্য উন্মোচন, স্ত্রী ও ৩ ছেলে গ্রেফতার

মোঃ নাজমুল হোসেন, জেলা প্রতিনিধি, পিরোজপুরঃ
১০ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৩৭ পিএম
শেয়ার করুন:
ঘুন পোকার গুঁড়োর সূত্রে ১৬ ঘণ্টায় ক্লুলেস হত্যা রহস্য উন্মোচন, স্ত্রী ও ৩ ছেলে গ্রেফতার

নদীর বেরিবাঁধের পাশে পড়ে ছিল এক ব্যক্তির রক্তাক্ত মরদেহ। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল, নির্জন ওই স্থানটিতেই হয়তো তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে তদন্তকারী পুলিশের তীক্ষ্ণ নজরে ধরা পড়ে মরদেহের মাথা ও কানের পাশে লেগে থাকা সামান্য ‘ঘুন পোকার গুঁড়ো’। অতি ক্ষুদ্র এই আলামতের সূত্র ধরেই উন্মোচিত হলো এক রোমহর্ষক পারিবারিক হত্যা রহস্যের জট। 

মাত্র ১৬ ঘণ্টার ব্যবধানে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া পুলিশ জানতে পারে, বেরিবাঁধের পাশে নয়, ইসমাইল শরীফ (৬০) নামের ওই বৃদ্ধকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাঁর নিজের বসতঘরেই! পরে ঘটনাটি আড়াল করতে মরদেহ ফেলে রাখা হয় নদীর বেরিবাঁধে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী ও তিন ছেলেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা কুঠারসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত। 

গ্রেফতারকৃতরা হলেন— নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগম এবং তাদের তিন ছেলে রুবেল শরীফ, রুমান শরীফ ও রাসেল শরীফ। রোমহর্ষক এই ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই জয়নাল শরীফ বাদী হয়ে ভাণ্ডারিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। 

রবিবার (৯ আগস্ট) রাতে ভাণ্ডারিয়া থানায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য নিশ্চিত করেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিবার সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা এলাকার বেরিবাঁধ সংলগ্ন স্থানে এক ব্যক্তির রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং নিহতের পরিচয় ইসমাইল শরীফ বলে শনাক্ত করে। প্রাথমিক অবস্থায় এটি একটি সম্পূর্ণ ‘ক্লুলেস’ হত্যাকাণ্ড বলে মনে হয়েছিল। পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানোর পাশাপাশি নিবিড় ছায়া তদন্ত শুরু করে।

প্রাথমিক সন্দেহের তালিকায় থাকা নিহতের স্ত্রী ও তিন ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়। তবে শুরুতে তারা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। 

ঘটনার নাটকীয় মোড় আসে মরদেহের সুরতহাল ও ছবি বিশ্লেষণের সময়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নজরে পড়ে মৃতদেহের মাথা ও কান সংলগ্ন অংশে কাঠখেকো ঘুন পোকার মিহি গুঁড়ো। তখনই পুলিশের সন্দেহ জাগে, মূল ঘটনাস্থল বেরিবাঁধ নয়। মরদেহটি নিশ্চয়ই কোনো কাঠের ঘর বা কাঠের তৈরি স্থাপনার সংস্পর্শে ছিল।

এই সূত্র ধরে ইসমাইল শরীফের বসতঘরে তল্লাশি চালায় পুলিশ। সেখানে গিয়ে ঘরের বারান্দার চালের বাঁশ ও কাঠের গুঁড়ো, মাটির মেঝেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন এবং স্পষ্ট রক্তের দাগ দেখতে পান তদন্তকারীরা। এতে পুলিশের কাছে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, ইসমাইল শরীফকে নিজের ঘরেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশের টানা জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ভেঙে পড়েন নিহতের ছোট ছেলে রাসেল শরীফ। তাঁর দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ঘরের বারান্দার খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা কুঠার। পরে সিআইডির ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা মাটি, ঘুন পোকার গুঁড়োসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগমের শরীরেও রক্তের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ, যা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জের ধরেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া ও মারামারির ঘটনা ঘটত।

ভাণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান জানান, "ঘটনাস্থলের অতি ক্ষুদ্র আলামত ও তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র ১৬ ঘণ্টার মধ্যে ক্লুলেস এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন সম্ভব হয়েছে। গ্রেফতার চার আসামির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা ও অধিকতর তদন্ত শেষে আদালতে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট দাখিল করা হবে।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।