ভারতের হাসপাতালে বাংলাদেশির লাশ ৮ দিন আটকে রাখার অভিযোগ

অনলাইন ডেস্কঃ
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৩০ পিএম
শেয়ার করুন:
ভারতের হাসপাতালে বাংলাদেশির লাশ ৮ দিন আটকে রাখার অভিযোগ

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি হাসপাতালে বকেয়া চিকিৎসার বিল পরিশোধের অজুহাতে এক বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ টানা আট দিন আটকে রাখার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর স্ত্রীর পাসপোর্টও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জব্দ করে রেখেছিল বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের হস্তক্ষেপে অতিরিক্ত কোনো অর্থ পরিশোধ ছাড়াই মরদেহ ও পাসপোর্ট ফেরত পেয়েছে পরিবার। 

ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম *টাইমস অব ইন্ডিয়া*-র এক প্রতিবেদনে এই অমানবিক ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে।

মৃত ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ আবদুল হাকিম সবুজ (৩২)। তিনি নওগাঁর বাসিন্দা এবং পেশায় একজন চুক্তিভিত্তিক সরকারি শিক্ষক ছিলেন। 

চিকিৎসা ও মৃত্যুর ঘটনা:
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কিডনিজনিত জটিলতার উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৫ সেপ্টেম্বর স্ত্রী তানজিলা ইসলাম আশাকে সঙ্গে নিয়ে বেঙ্গালুরু যান সবুজ। পরদিন (৬ সেপ্টেম্বর) তাঁকে ওল্ড এয়ারপোর্ট রোডের মণিপাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তানজিলা ইসলাম জানান, হাসপাতালে ভর্তির পরপরই সবুজের শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা বৃদ্ধি পেলে তাঁকে দ্রুত আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপে হাসপাতালের দাবিমতো তিনি মোট ৭ লাখ ৫০ হাজার রুপি পরিশোধ করেন।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ সেপ্টেম্বর সবুজের ডান পায়ে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করে পা কেটে ফেলেন। এতে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে এবং ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

মরদেহ ও পাসপোর্ট আটকে রাখার অভিযোগ:  
স্বামীর মৃত্যুর পর তানজিলা মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ নিলে জটিলতা শুরু হয়। তানজিলার অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার বকেয়া বাবদ এক লাফে ৩৫ লাখ ৭৯ হাজার রুপি দাবি করে বসে। ওই অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ না করলে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দেয়। একই সঙ্গে তানজিলার পাসপোর্টও আটকে রাখা হয়। 

সবুজের স্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, চিকিৎসার সম্ভাব্য মোট ব্যয় সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ আগে থেকে তাঁদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা দেয়নি। এমনকি পূর্বে পরিশোধ করা সাড়ে সাত লাখ রুপির কোনো আনুষ্ঠানিক রসিদও (মানি রিসিট) তাঁদের প্রদান করা হয়নি।

হাইকমিশনের হস্তক্ষেপে সমাধান:  
বিদেশ বিভূঁইয়ে এমন চরম মানবিক সংকটে পড়ে দিশেহারা তানজিলা দ্রুত বেঙ্গালুরুতে অবস্থানরত বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তা কামনা করেন। হাইকমিশনের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং স্থানীয় কয়েকজনের তৎপরতায় দীর্ঘ আট দিন পর, গত ২৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। 

সবুজের সঙ্গে থাকা পারিবারিক বন্ধু মোহাম্মদ মোক্তাদির হোসেন নিশ্চিত করেছেন, হাইকমিশনের হস্তক্ষেপে পূর্বে পরিশোধিত সাড়ে সাত লাখ রুপির বাইরে হাসপাতালকে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে হয়নি এবং একই সাথে তানজিলার পাসপোর্টও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
মরদেহ ও পাসপোর্ট আটকে রাখার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও এক বিবৃতিতে রোগীর শারীরিক জটিলতার ব্যাখ্যা দিয়েছে। হাসপাতালের দাবি, সবুজ অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কম ছিল এবং আইসিইউতে নেওয়ার পর দুই দফা তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) হয়ে যায়। পরে কৃত্রিম হৃদ্‌ফুসফুস সহায়তা (ECMO) ও মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর দিয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর ফুসফুসের রক্তনালী থেকে রক্ত জমাট অপসারণে অস্ত্রোপচারও করা হয়েছিল। তবে চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।

মরদেহটি ইতোমধ্যেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও, অর্থ লেনদেনের রসিদ না দেওয়া এবং মরদেহ ও পাসপোর্ট আটকে রাখার বিষয়ে মণিপাল হাসপাতালের বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।