ছেলেরা অসুস্থ শুনেই জ্ঞান হারাচ্ছেন মা, জানেন না চারজনের কেউই বেঁচে নেই

অনলাইন ডেস্কঃ
May 15, 2026 - 11:47
ছেলেরা অসুস্থ শুনেই জ্ঞান হারাচ্ছেন মা, জানেন না চারজনের কেউই বেঁচে নেই

অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে একে একে ওমানে পাড়ি জমিয়েছিলেন চার ভাই। কঠোর পরিশ্রমে নিজেদের ভাগ্য বদলেছিলেন, মাথা গোঁজার জন্য গ্রামে তৈরি করেছিলেন দোতলা পাকা বাড়ি। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ওমানের মুলাদ্দা এলাকায় একটি গাড়ির ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে দমবন্ধ হয়ে একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন সেই চার রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

নিহত চার ভাই হলেন—চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বন্দারাজার পাড়ার কৃষক মৃত আবদুল মজিদের ছেলে মুহাম্মদ রাশেদ (৪০), মুহাম্মদ সাহেদ (৩৫), মুহাম্মদ সিরাজ (২৮) ও মুহাম্মদ শহিদ (২৪)।

শেষ সেই ফোন কল

গত বুধবার রাতে বড় ভাই রাশেদ ওমান থেকে দেশে মায়ের কাছে ফোন করেছিলেন। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে জানিয়ে তিনি মায়ের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। রাশেদ জানিয়েছিলেন, তাঁরা চার ভাই মিলে দ্রুত হাসপাতালে যাচ্ছেন। ফোনের মাত্র দশ মিনিট পর থেকেই তাঁদের সবার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। এর প্রায় আধঘণ্টা পর ওমানের একটি হাসপাতালের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতর থেকে তাঁদের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির ভেতরে কোনো বিষাক্ত গ্যাসের কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।

অপেক্ষায় ছিল বিয়ের সানাই, বাজল শোকের মাতম

পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোট দুই ভাই সিরাজ ও শহিদের বিয়ে করার কথা ছিল। সেজন্য তাঁরা কেনাকাটা সেরে আজ শুক্রবারের ফ্লাইটে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। বিমানে ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগেই চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তাঁরা। তাঁদের বিয়ের আনন্দ এখন বিষাদে রূপ নিয়েছে।

জানেন না মা, গ্রামজুড়ে স্তব্ধতা

বাড়ির সামনে প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের ভিড় থাকলেও ফটক তালাবদ্ধ। ভেতরে শয্যাশায়ী মা খাদিজা বেগম। ছেলেরা অসুস্থ—কেবল এটুকু শুনেই তিনি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। চার ছেলের কেউই আর বেঁচে নেই, এই নিদারুণ সত্য জানানোর সাহস পাননি একমাত্র বেঁচে থাকা ভাই এনাম। তিনি বলেন, "মা এই শোক সহ্য করতে পারবেন না, তাই আমরা বাড়িতে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছি না।" নিহত বড় দুই ভাইয়ের স্ত্রীরাও শোকে পাথর হয়ে পড়েছেন।

দারিদ্র্য জয়ের এক বিষাদময় লড়াই

প্রায় ১০-১২ বছর আগে বড় ভাই রাশেদ অনেক ধারদেনা করে ওমানে গিয়েছিলেন। সেখানে শেখের গাড়ি চালকের কাজ পাওয়ার পর একে একে তিন ছোট ভাইকেও নিজের কাছে নিয়ে যান। চার ভাইয়ের সম্মিলিত চেষ্টায় পরিবারটি সচ্ছল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই সচ্ছলতার কারিগররাই আজ নিথর দেহে দেশে ফেরার অপেক্ষায়।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, শোকার্ত পরিবারটির পাশে আছে উপজেলা প্রশাসন। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।একই পরিবারের চার চেরাগ নিভে যাওয়ায় পুরো রাঙ্গুনিয়ায় এখন নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। তাঁদের এই আত্মত্যাগ ও স্বপ্নভঙ্গের গল্পে বিমর্ষ আজ পুরো গ্রাম।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow